
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে যখন রাজপথজুড়ে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ এবং প্রাণ বাঁচানোর লড়াই চলছিল, তখনও সংবাদ সংগ্রহে নিরলস ছিলেন সাংবাদিকরা। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও নোটবুক হাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা তুলে ধরেছেন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান ছয়জন সংবাদকর্মী।

গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হলেও নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের প্রশ্ন এখনো একই—কবে হবে হত্যার বিচার, কবে মিলবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি? তদন্তের ধীরগতি, বিচার প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটছে তাদের স্বজনদের।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রথম নিহত হন ঢাকা টাইমসের স্টাফ রিপোর্টার হাসান মেহেদী। ১৮ জুলাই বিকেলে রাজধানীতে সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। একই দিন উত্তরায় দায়িত্ব পালনকালে গুলিতে নিহত হন দৈনিক ভোরের আওয়াজের প্রতিবেদক শাকিল হোসাইন। একই দিনে দুই সাংবাদিকের মৃত্যু গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি বলেন, তাঁদের মেয়েরা এখনো বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। ছোট মেয়েটি বাবার ছবি বুকে নিয়েই ঘুমায়। অন্যদিকে, হাসান মেহেদীর বাবা প্রবীণ সাংবাদিক এইচ এম মোশাররফ হোসেন এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এরই মধ্যে তিনি একাধিকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।
শাকিল হোসাইনের বাবা মো. বেলায়েত হোসেন ও মা রাশেদা বেগমও দুই বছর পরেও ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। বেলায়েত হোসেন জানান, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে এখনো মনে হয় ছেলেকে দেখেছেন। তিনি উত্তরা-পূর্ব থানায় হত্যা মামলা করলেও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাননি। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা, জীবদ্দশায় ছেলের হত্যার বিচার দেখে যাওয়া।
১৯ জুলাই সিলেটে সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব। একই দিন রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছবি তুলতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়।
তাহির জামান প্রিয়র মৃত্যুর সবচেয়ে বড় শূন্যতা অনুভব করছে তাঁর ছয় বছরের মেয়ে পদ্ম। দাদি শামসি জানান, অন্য শিশুদের বাবার সঙ্গে দেখলে পদ্ম চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ক্যামেরা দেখলেই বাবার কথা মনে পড়ে এবং প্রায়ই জানতে চায়, “আমার বাবা কোথায়?” তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি এবং তিনি শুধু ন্যায়বিচার দেখতে চান।
অন্যদিকে, তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ বলেন, তাঁদের মা এখনো একটাই প্রশ্ন করেন—ছেলের হত্যার বিচার হবে কি না। তিনি জানান, তুরাব হত্যা মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাননি পরিবারের সদস্যরা।
৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে গুলিতে নিহত হন দৈনিক খবরপত্রের প্রতিবেদক প্রদীপ কুমার ভৌমিক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। তাঁর ছোট ছেলে সুজন বাবার পথ অনুসরণ করে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিয়েছেন এবং বর্তমানে কালের কণ্ঠের রায়গঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।
সুজনের অভিযোগ, মৃত্যুর পর তাঁর বাবাকে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রচার করা হয়। অথচ প্রদীপ কুমার ভৌমিক ছিলেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও রায়গঞ্জ উপজেলা সেক্রেটারি। তিনি জানান, তিনবার আবেদন করেও এখনো কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি।
সবশেষে ৫ আগস্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার সামনে দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল আখঞ্জি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর পরিবার জানে না মামলার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে। স্ত্রী মৌসুমি আক্তার তিন সন্তানকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন। সরকারি ও বিভিন্ন উৎস থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। সবচেয়ে ছোট মেয়েটি এখনো বিশ্বাস করে, তার বাবা বিদেশে গেছেন এবং একদিন ফিরে আসবেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাসে এই ছয় সাংবাদিকের আত্মত্যাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। কিন্তু এক বছর পরও তাদের পরিবার বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়েই অপেক্ষা করে চলেছে।
মন্তব্য করুন