বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ওয়াকআউট এখন বিরোধী দলের প্রতিবাদের পরিচিত একটি রীতি। কোনো সিদ্ধান্ত, বক্তব্য বা সংসদ পরিচালনার ধরন নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে বিরোধী দল কিংবা কোনো সংসদ সদস্য অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলে সেটিকে ওয়াকআউট বলা হয়। স্বাধীনতার পর দেশের সংসদীয় ইতিহাসেও বিভিন্ন সময়ে এমন প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেছে।

তবে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রথম ওয়াকআউটটি করেছিলেন কে, কবে এবং কী কারণে-এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় সংসদের পুরনো কার্যবিবরণী ও সে সময়ের সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ এবং সংসদ বিষয়ে অভিজ্ঞ সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী সংসদ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত কার্যবিবরণীর উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটে প্রথম জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে।
সংসদ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের ২১ জানুয়ারি সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে ওয়াকআউট করেন তৎকালীন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. আবদুল্যা সরকার।
কার্যবিবরণীতে তার বক্তব্যের অংশে উল্লেখ রয়েছে, তিনি স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, আগের দিন ঢাকায় জনগণের ওপর রক্ষীবাহিনী যে ‘ঘৃণ্য অত্যাচার’ চালিয়েছিল, সে বিষয়ে তাকে সংসদে বক্তব্য রাখতে না দেওয়ায় তিনি ওয়াকআউট করছেন। এরপর তিনি সংসদ সদস্যদের কক্ষ ত্যাগ করেন।
আবদুল্যা সরকার ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে তিনি জাসদে যোগ দেন।
প্রথম ওয়াকআউটের পেছনে ছিল আগের দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা।
সংসদের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি ঢাকায় জনগণের ওপর রক্ষীবাহিনীর কথিত নির্যাতনের বিষয়ে ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন আবদুল্যা সরকার।
তিনি বক্তব্য শুরু করলে তৎকালীন আইন ও সংসদ বিষয়াবলী মন্ত্রী শ্রী মনোরঞ্জন ধর আপত্তি জানান। তিনি স্পিকারকে বলেন, এটি পয়েন্ট অব অর্ডার’ নয়।
এরপর আবদুল্যা সরকার বলেন, তাকে বক্তব্য রাখতে না দেওয়ায় তিনি ওয়াকআউট করছেন। তার ওয়াকআউটের পর মনোরঞ্জন ধর তার দেওয়া বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি তৎকালীন বিরোধী দল জাসদ ‘গণ প্রতিরোধ দিবস’ এবং সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচি পালন করে।
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষ ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। তবে বিরোধী দলগুলো ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল ও সমাবেশ শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রক্ষীবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর-বর্তমান বিজিবি-এবং পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপসহ বিভিন্নভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
সে সময়ের দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনে এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চেষ্টা ও ঢাকার বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগে রক্ষীবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জসহ বিভিন্ন ঘটনায় আনুমানিক অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
এই ঘটনার পরদিন, ২১ জানুয়ারি, সংসদে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন আবদুল্যা সরকার। কিন্তু বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি না পাওয়ায় তিনি অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। এটিই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম ওয়াকআউট হিসেবে সংসদীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।
সে সময়ের সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। দৈনিক বাংলার ২১ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ দিয়েছিলেন জাসদ সদস্য সাত্তার মো. আবদুল্লাহ। এটিই ওই সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের প্রথম চেষ্টা ছিল।
তবে ডেপুটি স্পিকার মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ নোটিশটি নাকচ করে দেন। এরপরই আবদুল্যা সরকার বৈধতার প্রশ্ন তুলে ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আলোচনার সুযোগ চান। কিন্তু তাকে বক্তব্য দিতে না দেওয়ায় তিনি একাই ওয়াকআউট করেন।
দৈনিক বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, যে প্রসঙ্গ নিয়ে আবদুল্যা সরকার ওয়াকআউট করেছিলেন, সেটি আগে উত্থাপন করেছিলেন জাসদ সদস্য সাত্তার। তবে সাত্তার তার সঙ্গে ওয়াকআউটে যোগ দেননি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয় পায়। বাকি আসনগুলোর মধ্যে জাসদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পাঁচটি আসনে জয়ী হন।
নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি এবং কোথাও কোথাও ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগও তুলেছিল অংশ নেওয়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো।
প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল। বিরোধী পক্ষে পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য না থাকায় ওই সংসদে প্রথাগত অর্থে স্বীকৃত কোনো বিরোধী দল ছিল না। তবুও সংসদের শুরু থেকেই বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।
এমনকি সংসদের প্রথম দিনেই সদস্যদের শপথ গ্রহণের আগে ও পরে নানা বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
তখন বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় অধিবেশন বসত তেজগাঁওয়ের পুরনো সংসদ ভবনে। ভবনটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রথম সংসদের প্রথম দিনে আছাদুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে স্পিকার নির্বাচিত হন মুহম্মদুল্লাহ এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ।
১৯৭৪ সালের নভেম্বরে আবদুল্যা সরকার জাসদে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাকশালে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৫ সালের ২৮ এপ্রিল তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরদিন দৈনিক বাংলায় ‘সংসদে আবদুল্লাহ সরকার ও ময়নুদ্দিন মানিকের আসন শূন্য ঘোষণা’ শিরোনামে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কুমিল্লা-২ থেকে নির্বাচিত আবদুল্যা সরকার এবং রাজশাহী-১১ থেকে নির্বাচিত ময়নুদ্দিন আহমদ মানিকের আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে যোগ না দেওয়ায় রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী সংবিধানের ১১৭-ক অনুচ্ছেদের ৫(ক) দফা অনুসারে তাদের আসন শূন্য হয়।
২০১৩ সালে মৃত্যুর আগে আবদুল্যা সরকার বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদে যে ওয়াকআউটের সূচনা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের প্রতীকী প্রতিবাদের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেও ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। সরকারি দলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এবং একপেশেভাবে সংসদ পরিচালনার অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেও রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের ঘটনা আলোচনায় আসে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সংসদে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিরোধী জোট। সরকারি দল বিএনপি তাতে সায় না দেওয়ায় রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর আগে প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন জামায়াত ও এনসিপি জোটের সদস্যরা।
তবে স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম ওয়াকআউটের নজিরটি রয়ে গেছে ১৯৭৪ সালের ২১ জানুয়ারিতে-যেদিন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে একাই সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. আবদুল্যা সরকার।
চাইলে এটাকে আমি আরও অনুসন্ধানী/ফিচারধর্মী ভাষায়, অথবা অনলাইন পোর্টালের জন্য ৬০০-৭০০ শব্দের টানটান ভার্সনেও সাজিয়ে দিতে পারি।
মন্তব্য করুন