
বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিতে আগ্রহী হলেও সে অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন চান। অথচ এ সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার এই ঘাটতি দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে আন্তর্জাতিক রিকভারি ডে ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব তথ্য ও মতামত উঠে আসে। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রফেশনালস (আইসাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাস বিশ্বব্যাপী ‘রিকভারি মাস’ হিসেবে পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘রিকভারি ইজ রিয়েল: রিস্টোরিং এভরি অ্যাসপেক্ট অভ লাইফ’, যার অর্থ ‘সেরে ওঠা বাস্তব: জীবনের প্রতিটি দিক পুনরুদ্ধার।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন। এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সেই মাদক গ্রহণের প্রবণতা শুরু হচ্ছে। ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেন। আর ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে মাদক গ্রহণ শুরু করেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের কাছে মাদক সহজলভ্য।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী চিকিৎসা বা পুনর্বাসন চান। পাশাপাশি ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবা নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসা নিতে আগ্রহী মানুষের সঙ্গে বাস্তবে সেবা পাওয়া মানুষের মধ্যে এই বড় ব্যবধান দেশে মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। অপ্রতুল বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা এবং মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এম. এ. মোহিত কামাল বলেন, মাদক থেকে টেকসইভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুধু চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে ফ্যামিলি সাপোর্ট, আফটারকেয়ার, পিয়ার সাপোর্ট, রিল্যাপ্স প্রিভেনশন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চিকিৎসা শেষ করার পর কেউ যদি আবার পুরোনো পরিবেশ, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক কলঙ্কের মধ্যে ফিরে যান, তাহলে পুনরায় মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে ‘নেশাখোর’ বা অপমানজনক কোনো পরিচয়ে না ডেকে অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
মোহিত কামাল বলেন, ‘একজন মানুষের বর্তমান সমস্যাই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতাই রিকভারির পথকে সহজ করে।’
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মাদক থেকে মানুষ সেরে উঠতে চায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তাই মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে নীতিনির্ধারকদের প্রতি জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট ও কাউন্সেলিং সেবা যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানো এবং নারী ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখি গাঙ্গুলী। এতে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার জামিউল আহ্সান শিপু, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘আশ্রয়’-এর পরিচালক মো. শামীম খান, সেফ হোম মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক লুৎফর রহমান মানিক এবং ‘উৎস’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মোঃ শাহাবুদ্দিন চৌধুরী সুমন।
মন্তব্য করুন