
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নানা দিক তুলে ধরেছেন নাহিদ ইসলাম। দীর্ঘ এই আলোচনায় তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সংস্কার, বিচার, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন রাজনৈতিক স্বাধীনতা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধূসর হয়ে যাচ্ছে। সংস্কার, বিচার এবং গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ যে অবস্থায় পৌঁছেছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। তবুও আগামী প্রজন্ম এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
এ অবস্থার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকার দিকেই ইঙ্গিত করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, সরকারটির চরিত্র শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল না। এটি কি কেবল জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি কেয়ারটেকার সরকার, নাকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়নের সরকার—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে সর্বদলীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা বাস্তবে সম্ভব হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারেরই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার সক্ষমতা ছিল। কিন্তু এখন কোনো বিষয়ে ঐকমত্য হলেও নির্বাচিত সরকার তা মানছে না।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অভিযোগ করেন, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকেই নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, বিচার ও সংস্কার বাস্তবায়নে যে ঘাটতি রয়েছে, তার দায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিতে হবে।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর সরকার কী অর্জন করেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বাজেটে কিছু আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা অন্তর্বর্তী সরকার রেখে গেলেও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি এবং বিচার প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে বিএনপিরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অতীতের সব গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও দলটি কোনো অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যার পরিণতিও তাদের জন্য ইতিবাচক হয়নি।
তবে জাতীয় স্বার্থে সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা এবং জনগণকে সংগঠিত করাই এনসিপির লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দাবি আদায়ে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান জাতীয় নাগরিক পার্টির আকাঙ্ক্ষা নয়। তাঁর ভাষায়, “ফের গণঅভ্যুত্থান হোক বা সরকার সে ধরনের পরিস্থিতিতে যাক—এনসিপি তা চায় না। সব দাবি আদায়ের জন্য বারবার গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।”
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে নিজের নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১১ নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, এলাকার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিরোধী দল হওয়ায় এনসিপির কাজ করার সুযোগ সীমিত এবং বরাদ্দও কম। তাঁর অভিযোগ, সরকারের সমালোচনা করলে বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও চাপের মুখে পড়তে হয়।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের দলীয় প্রশাসক স্থানীয় পরাজিত প্রার্থীকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যদের বিরোধীদলীয় আসনগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে—এমন গুঞ্জনের কথাও উল্লেখ করেন। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবের পাশাপাশি সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। একই সঙ্গে সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করাই এনসিপির আগামীর রাজনৈতিক লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মন্তব্য করুন