
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের মধ্যেই বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ডের সন্ধান পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে লাওস, পাকিস্তান, চীনসহ পাঁচ দেশের প্রায় ৩০০ নাগরিকের সাইবার অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য সামনে এসেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুটি ঘটনায় শতাধিক ল্যাপটপ ও প্রায় দুই হাজার আইফোনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। সংঘবদ্ধ চক্রটি অনলাইনে কম দামে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করত। পরে এসব তথ্য ব্যবহার করে চালানো হতো ডিজিটাল প্রতারণা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, প্রশাসনের নজর এড়াতে ঢাকার পরিবর্তে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরকে সাইবার অপরাধের ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিল চক্রটি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন স্ক্যাম, জুয়া ও বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান জোরদার হয়েছে। ওই দেশগুলোতে অপরাধীদের ওপর চাপ বাড়ার পর তাদের একটি অংশ বাংলাদেশকে নতুন অবস্থান হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশীতে অভিযান চালিয়ে এক হাজারের বেশি আইফোন ও ১৩৪টি ল্যাপটপসহ ৬৭ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন নাগরিক ছিলেন। অন্যরা পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও নেপালের নাগরিক।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপকমিশনার শামীম হোসেন বলেন, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে সাইবার স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলছে। সেখানে কার্যক্রম চালাতে না পেরে তারা বাংলাদেশসহ অন্য দেশকে বেছে নিয়ে থাকতে পারে। এভাবেই বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে কক্সবাজারেও একই ধরনের অপরাধের তথ্য পায় পুলিশ। সেখানে তিন শতাধিক বিদেশি নাগরিক হোটেল ভাড়া নিয়ে একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি শনাক্ত হয়। ওই ঘটনায় ছয় চীনা নাগরিককে আটক করা হয়।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহমেদ বলেন, দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিরা বিদেশি নাগরিক হওয়ায় এর সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকতে পারে। এসব বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল অপরাধে জড়িত বিদেশি নাগরিকেরা কৌশল পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো শহরে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের ধারণা, রাজধানীর তুলনায় এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের নজর তুলনামূলক কম থাকায় অপরাধীরা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ঢাকায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তা দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরে আসে এবং সরকারের নজরদারিও বাড়ে। বিপরীতে কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের ঘটনা অনেক সময় একই মাত্রায় আলোচনায় আসে না। এই সুযোগকেই অপরাধীরা কাজে লাগিয়ে এসব এলাকাকে অপরাধ পরিচালনার জন্য বেছে নিতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পর্যটন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে প্রবেশের পরিচয় দিলেও বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও তদন্ত দক্ষতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
মন্তব্য করুন