
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বিদ্যুতের ভোগান্তি কমছে না। বরং বুধবারের তুলনায় বৃহস্পতিবার বিকালে বিদ্যুতের ঘাটতি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকাল ৪টার দিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮১ মেগাওয়াট। বুধবার একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সচল করতে প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। সংশ্লিষ্টরা এক সপ্তাহ সময় চাইলেও পিডিবির কর্মকর্তারা আশা করছেন, পাঁচ দিনের মধ্যেই ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলেও বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও আবার চালু হয়েছে। ফলে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেই বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৩৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে এসেছে ৭৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
এলএনজি সরবরাহ আগের সংকটকালীন সময়ের তুলনায় বাড়লেও বিদ্যুতের ঘাটতি কেন এতটা বেড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়লেই সব বিদ্যুৎকেন্দ্র তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে না। কেন্দ্রের কারিগরি সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিও উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
পিডিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সবসময় সম্ভব হয় না। কারিগরি সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদার ওপরও উৎপাদন নির্ভর করে। ফলে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চাহিদা বেশি থাকায় লোডশেডিং কমানো যাচ্ছে না।
পিডিবির ২৬ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে ৪ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কারণে আরও ১ হাজার ৭৭৮ মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ১ নম্বর ইউনিটটিও সম্প্রতি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একাধিকবার বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির ৩ নম্বর ইউনিট চালু রয়েছে। পাশাপাশি বাঘাবাড়ির ১০০ মেগাওয়াট ও সিরাজগঞ্জের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ রয়েছে।
সরকারি হিসাবের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় আরও লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে গরমের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
রামপুরার উলনের বাসিন্দা সোহাগ সরকার বলেন, সারা দিন গরমের মধ্যে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাসায় শিশু ও বয়স্ক মানুষ থাকায় তাদের নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। কখন বিদ্যুৎ যাবে বা আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। তার ভাষ্য, আগে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি দেওয়া হলেও এখন সেটিও করা হচ্ছে না।
মিরপুরের বাসিন্দা রেখা রাণী জানান, সন্ধ্যার পর কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে গেছে। রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভোগান্তি বেশি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শাহজাহানপুরের বাসিন্দা রতন কুমার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, ফ্যান ও পানির পাম্প ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, একদিকে গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুতের সংকট-দুই দিক থেকেই মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দেশে মোট ১৫ হাজার ৫৫২ দশমিক ৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৭০২ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৯৭০ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) থেকে ৩ হাজার ১৮৪ দশমিক ১২ মেগাওয়াট এবং বিদ্যুৎ আমদানি থেকে ২ হাজার ৩০৪ দশমিক ৪৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়।
এ ছাড়া জলবিদ্যুৎ থেকে ২২০ মেগাওয়াট, ডিজেলচালিত (এইচএসডি) কেন্দ্র থেকে ১৫০ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
মন্তব্য করুন