
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কয়েক দিন ধরে উত্তপ্ত গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি-ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকসহ সাধারণ মানুষ। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন, ভাঙচুর করা হচ্ছে ক্যামেরা ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম।

গত কয়েক দিনে অন্তত ছয় সাংবাদিক হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন। শুধু সাংবাদিকরাই নন, আন্দোলনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তৌফিক হোসেন নামে এক পোশাকশ্রমিকও।
প্রশ্ন উঠেছে, শ্রমিক আন্দোলনের ছবি বা ভিডিও ধারণ করলেই কেন হামলার শিকার হতে হচ্ছে? সহিংসতার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হলে কেন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন, ভেঙে ফেলা হচ্ছে ক্যামেরা? কারা চায় না আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ পাক? এসব প্রশ্ন এখন গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এসব ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করা হচ্ছে। ফলে আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হামলার শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন সময় টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি ও তাঁর ক্যামেরাপারসন, এখন টিভির প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠের কালিয়াকৈর প্রতিনিধি, দীপ্ত টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি, দৈনিক দেশ রূপান্তর ও এশিয়া পোস্টের গাজীপুর প্রতিনিধি এবং এসএ টিভির ক্যামেরাপারসন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের ছবি তুলতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
নাওজোরে ছবি তুলতে নিষেধ, কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল
মঙ্গলবার গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পুরোনো কাগজপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীদের একটি অংশের কয়েকজন যুবক। এ সময় তাঁদের চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, কেউ যেন ছবি না তোলেন।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকেরা উপস্থিত থাকলেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে পারেননি। কয়েকজন সাধারণ মানুষ মোবাইল ফোনে ছবি তোলার চেষ্টা করলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কারও কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, আবার কারও ফোন ভেঙে ফেলা হয়।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য, শুধু নাওজোর নয়, শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেই একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কোথাও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য ধারণ করতে গেলে, আবার কোথাও যানবাহন ভাঙচুরের ছবি তুলতে গেলেই বাধার মুখে পড়ছেন সংবাদকর্মীরা। অনেক ক্ষেত্রে হামলার আশঙ্কায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারছেন না তাঁরা। এতে সহিংসতার প্রকৃত চিত্র এবং এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ছবি তুলতে গিয়ে প্রাণ গেল শ্রমিক তৌফিকের
সাংবাদিকদের পাশাপাশি ছবি ধারণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে সোমবার গাজীপুর মহানগরীর বাংলাবাজার এলাকায়। সেখানে শ্রমিক আন্দোলনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন তৌফিক হোসেন নামে এক পোশাকশ্রমিক। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় তৌফিক শ্রমিকদের বিক্ষোভের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন। এ সময় কয়েকজন পোশাকশ্রমিক তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তবে কী কারণে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছিল এবং কারা এ ঘটনায় জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একজন শ্রমিকের এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনায় চলমান আন্দোলনে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে।
পুলিশের বক্তব্য ও স্থানীয় নেতাদের উদ্বেগ
এ বিষয়ে বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন অর রশিদ জানান, ছবি তুলতে গিয়ে সাংবাদিকদের হামলার শিকার হওয়ার বিষয়টি তাঁরা জানতে পেরেছেন। সাধারণ মানুষ সহিংসতার ছবি ধারণ করতে গেলে তাঁদের ওপর হামলা, মোবাইল ফোন ভাঙচুর ও ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
কোনাবাড়ী থানার ওসি ইফতেখার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেই তাঁদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হচ্ছে। এতে ঘটনাস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের হামলায় একাধিক সাংবাদিক আহত হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জামের ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ছবি তুললে হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।
কোনাবাড়ী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পোশাকশ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন। এ আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলেই তাঁদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপরও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকেরা তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে তাঁদের বাধা দেওয়া কিংবা হামলা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনের পাশাপাশি সহিংসতার ঘটনা এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ছবি-ভিডিও ধারণের সময় হামলার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করার দাবি উঠছে।
মন্তব্য করুন