
ভারতের মেঘালয় রাজ্যসংলগ্ন শেরপুরের তিন উপজেলার সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন ভারতীয় ব্র্যান্ডের মাদক দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও জেলা পুলিশের তৎপরতায় নিয়মিত মাদক উদ্ধার হলেও বন্ধ হচ্ছে না চোরাচালান। এসব কারবারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের এখনো শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার প্রায় ৪২ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই মাদক উদ্ধার বা জব্দের ঘটনা ঘটছে। মাঝেমধ্যে মাদক বহনের অভিযোগে ট্রাকচালক, অটোরিকশাচালক ও ভ্যানচালকদের আটক করা হলেও তাঁদের অনেকেই পরে জামিনে মুক্তি পান। তবে মাদক সরবরাহের নেপথ্যে থাকা মূল কারবারি বা গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
সীমান্ত এলাকার কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদকসহ কাউকে আটক করার পর কখনো কখনো অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের খবর আগেভাগে পেয়ে চোরাকারবারিরা ভারত থেকে আনা মাদক বনজঙ্গলে ফেলে পালিয়ে যায়। এসব কারণে মাদক চোরাচালানের মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তাঁদের দাবি।
সীমান্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কিছু সদস্যও অবৈধভাবে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে মাদকের প্রতি আসক্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত করা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
ময়মনসিংহের ৩৯ বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে আট মাসে পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোট ১৭ কোটি ১১ লাখ ৩ হাজার ২২০ টাকা মূল্যের চোরাচালানি পণ্য ও মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে বিজিবি।
বিজিবির দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জব্দ করা এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এ ছাড়া শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ভারতীয় এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি পণ্যের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে পরিচালিত অভিযানে ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার ৮২০ টাকা মূল্যের চোরাচালানি মালামাল জব্দ করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, এসব অপরাধে জড়িত মোট ৪৩ জন আসামির তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন অভিযানে ২৪ জনকে হাতেনাতে আটক করে প্রচলিত নিয়মে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অভিযানের সময় পালিয়ে যাওয়া বাকি ১৯ জনের নাম-পরিচয় শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরুল আজিম বায়জিদ বলেন, সীমান্তে চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। দুর্গম পাহাড়ি পথকে যারা অপরাধের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে, তাদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শিশু-কিশোর ও তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া অপরাধী এবং তাদের পেছনে থাকা গডফাদার-কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে সীমান্তে নিয়মিত অভিযান ও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের পরও চোরাচালান বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক পাচারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে এ অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
মন্তব্য করুন