
তীব্র গরমের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত কয়েকদিনে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যুতের ঘাটতির পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়া এবং গ্যাস ও কয়লার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, গ্যাস ও কয়লার সংকটের কারণে স্বাভাবিক সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর হিসাব অনুযায়ী, রোববার বিকাল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
বিকাল ৫টার দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। তখনও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এমন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি দেখা যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পিডিবির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিও হিমশিম খাচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায়। পিডিবি জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে পিক আওয়ারে আদানির কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও রোববার বিকাল ৫টায় সরবরাহ ছিল মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহণে সমস্যা হওয়ায় কেন্দ্রটির কয়লার মজুত কমে গেছে বলে পিডিবিকে জানিয়েছে আদানি কর্তৃপক্ষ। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে আদানির দেওয়া তথ্য কতটা সঠিক, তা সরেজমিনে যাচাই করতে পারেনি পিডিবি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ কেন্দ্রটি পরিদর্শনের সুযোগও নেই।
আমদানির বাইরে দেশের একাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন হচ্ছে না।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। রাতে সেটি চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার কেন্দ্রটিতে ওই সময় উৎপাদন হয়েছে ৭১০ মেগাওয়াট।
ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকেও সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিটে উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সংকটও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট।
এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কমপক্ষে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। রোববার বিকাল ৫টায় দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
পিডিবির হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট এবং কয়লা সংকট ও অন্যান্য সমস্যার কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে আরও অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। মূলত এই প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতির কারণেই সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।
এদিকে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এতে দেশজুড়ে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে এর বড় প্রভাব পড়ে।
মেরামতের পর গত ৫ আগস্ট রাতে টার্মিনালটি থেকে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। আগে এই দুই টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
সংশ্লিষ্টদের আশা, সবকিছু ঠিক থাকলে সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ শুরু হলে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
মন্তব্য করুন