ডেস্ক নিউজ:
বগুড়া শহরের ১১৫টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংক্রামক চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদে ধ্বংস করার পরিবর্তে বছরের পর বছর উন্মুক্ত স্থানে স্তূপ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান স্বপ্ন-এর বিরুদ্ধে। ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে চিকিৎসা বর্জ্যের বিশাল পাহাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশবাদী নেতার প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনায় হাজারো মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ চরম ঝুঁকিতে পড়লেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে কারণ দীর্ঘদিন ধরেও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বগুড়ার সদরের জয়পুরপাড়ায় এলাকার এই ময়লার স্তুপে সরেজমিনে দেখা যায়, বগুড়ার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের সেট, গ্লাভসসহ বিভিন্ন সংক্রামক চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত না করে বছরের পর বছর ধরে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে সেখানে সৃষ্টি হয়েছে চিকিৎসা বর্জ্যের বিশাল স্তূপ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসা বর্জ্যগুলো এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) বা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ধ্বংস করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা করা হচ্ছে না। বরং উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকা এসব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। অর্থাৎ অভিযোগ রয়েছে নামমাত্র এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) থাকলেও তা দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এই স্তুপ থেকে এসব ময়লা আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলেন এখানে যখন ময়লা পোড়ানো হয় তখন বিশাল ধোঁয়ার কুন্ডলীতে থাকাই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই বর্জ্যের স্তূপের পাশেই রয়েছে অন্তত ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া আশপাশে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র সড়কও বর্জ্যের স্তূপের পাশ দিয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিন অসংখ্যা শিক্ষার্থী, পথচারী ও বাসিন্দারা সংক্রামক পরিবেশের মধ্য দিয়ে এবং বৃষ্টির দিনে একেবারেই বিষাক্ত হাটু পানির মধ্যে দিয়েই চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ধমক পেতে হয়েছে। তারা দ্রুত চিকিৎসা বর্জ্য অপসারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বছরের পর বছর চিকিৎসা বর্জ্যের এমন স্তূপ তৈরি হওয়ার পরও কেন কার্যকর তদারকি হয়নি, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মাদ নিজেদের দায় এড়িয়ে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করে বলেন ওই বিষয়টি বগুড়া সিটি কর্পোরেশন দেখবেন।
অন্যদিকে চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান স্বপ্ন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ না করলে পরিবেশের আরও বেশি ক্ষতি হতো। তবে বিভিন্ন কারণে বর্তমানে বর্জ্য জমে থাকার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন এবং এগুলো দ্রুত সরিয়ে নেয়ার আশ^াস দেন।
জানা গেছে, শুধু বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মোহাম্মাদ আলী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। অথচ সেই অর্থের বিপরীতে নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতন মহলের দাবি, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা এবং তদারকির ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
এ বিষয়ে বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বগুড়া জেলা প্রশাসক মোঃ তৌফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি ইতিমধ্যে আমার নজরে এসেছে, অতি দ্রুত সময়ে এসব বর্জ্য সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হবে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হবে।
মন্তব্য করুন