
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছিল, তার নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ এই সময়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের নানা উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

উল্টো রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হওয়ায় ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে রয়েছে আরও ৩৩ হাজার ৮১৯ জন। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ কয়েক দফায় মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে মিয়ানমার এবং ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরুর কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই।
রোহিঙ্গাদের দাবি, শুধু তালিকাভুক্তি বা তথ্য যাচাই করলেই সংকটের সমাধান হবে না। মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অবাধ চলাচল এবং নিজ গ্রাম ও ভিটায় বসবাসের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জুবাইর বলেন, শুধু তালিকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ বদলাবে না। নিরাপদে নিজ গ্রামে ফেরার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ তৈরি এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দীর্ঘদিন প্রত্যাবাসন আটকে থাকায় ক্যাম্পগুলোতে হতাশার পাশাপাশি অপরাধ, মাদক, মানবপাচার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত হচ্ছে।
আরসা ও আরএসওসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা খুন হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগে আড়াই শতাধিক মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ক্যাম্প থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, বিদেশি রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রও উদ্ধার হচ্ছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। অপহরণ, মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা দমনে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্পের মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) মাথাপিছু মাসিক খাদ্য সহায়তা সাড়ে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলারে নামিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, সহায়তার পরিমাণ আরও কমলে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও তার শতাধিক অংশীদার সংস্থা যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে।
নয় বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ রোহিঙ্গার জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার আগের তুলনায় আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে মাদক, অপরাধ ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা যেখান থেকে বাংলাদেশে এসেছে, সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও শ্রমবাজারে। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসতি স্থাপন ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কারণে উখিয়া-টেকনাফের বনভূমির বড় অংশ ক্ষতিগ
মন্তব্য করুন