
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন-এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অপেক্ষা, তার অবসান হতে যাচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। শেষ মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম জানা গেলেও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকায় এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হলেও ইসি সূত্র বলছে, একাধিক মনোনয়নপত্রের মধ্যে যেকোনো একটি বৈধ হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, দলের স্থায়ী কমিটি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানের ওপর ন্যস্ত করেছে। এ কারণে আগাম প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে না বিএনপি। আগামী ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। আগামী ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এদিকে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রায় চূড়ান্ত বলেই মনে করা হচ্ছে। দুদিন আগে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর সম্মতিসূচক স্বাক্ষর অথবা লিখিত সম্মতি বিবৃতি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএনপির সূত্রের দাবি, গত শনিবার মির্জা ফখরুল ওই সম্মতিসূচক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন।
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় সংসদে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় শেষ পর্যন্ত বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত। ফলে মির্জা ফখরুলকে ঘিরেই এখন রাজনৈতিক আলোচনা সবচেয়ে বেশি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ সালে সবশেষ রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোট হয়েছিল। সেই সময় ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। ৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই মির্জা ফখরুলই এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী।
১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনকে পরাজিত করে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পান তিনি। প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও মির্জা ফখরুল রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় ছিলেন। ওই সময়ের সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে পরাজিত হন তিনি। তবে দলীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন।
পরে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি দলটির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমার শেষ মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই যে দলটির পছন্দের প্রার্থী, তা অনেকটাই স্পষ্ট। বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র দাখিলের মধ্য দিয়েই সেই অপেক্ষার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটবে।
মন্তব্য করুন