রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ভোটগ্রহণের জন্য সংসদের অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন আছে কি না-এ নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্যের বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে সংসদের অধিবেশন বসা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে সংসদ চাইলে এ উপলক্ষে বিশেষ অধিবেশন ডাকতে পারে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, এবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে সংসদের অধিবেশন ডাকা হবে।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।
সেবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় সংসদের অধিবেশন চলছিল না। পরে ভোটগ্রহণের জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল।
সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির প্রার্থী ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ, যিনি ওই নির্বাচনে পোলিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন, জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ প্রণয়নের পর প্রকাশ্য ভোটের ব্যবস্থা করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংসদের অধিবেশন ডাকা হয়েছিল।
ওই নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি বিচারপতি আবদুর রউফ নির্বাচনি কর্তার দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষেই ভোটগ্রহণ হয়।
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট বিকাল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের অধিবেশন ডাকা হবে কি না-এ বিষয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, এবারও অধিবেশন ডাকা হবে।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে অধিবেশন ডেকেই সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। এবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এক-দুই দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করা হতে পারে। তবে অধিবেশন নিয়মিত কার্যক্রমে যাবে কি না, নাকি ভোট শেষ হওয়ার পরই মুলতবি করা হবে—সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের অধিবেশন ডাকার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলেই সংসদ সদস্যদের ভোটার হিসেবে আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ভোটের স্থান হিসেবে সংসদ কক্ষ উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সেখানে ভোটগ্রহণে কোনো আইনি বাধা নেই।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন। অধিবেশন ডাকা হলে তাতেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সমস্যা নেই।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের অধিবেশন বসা বাধ্যতামূলক নয়।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচনের প্রয়োজনে বিশেষ অধিবেশন ডাকা যেতে পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তার মতে, এবার যদি একজনই বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজনও হবে না। ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর বৈধ একক প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা সম্ভব।
তবে একাধিক প্রার্থী থাকলেও তার মতে, শুধু ভোটগ্রহণের জন্য সংসদ অধিবেশন বসানো আইনগতভাবে অপরিহার্য নয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ওই দিনই সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে। বৈধ প্রার্থী একজন হলে ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। এরপর একমাত্র বৈধ প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
বর্তমান সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় দলটির সমর্থিত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিরোধী দল প্রার্থী দেবে না-এমন বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটি হবে কি না, তা ১৮ আগস্টের পরই নিশ্চিত হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রার্থীকে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
রাষ্ট্রপতি প্রার্থীকে অন্তত ৩৫ বছর বয়সী হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে আগে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না।
এ ছাড়া মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সমর্থক হিসেবে থাকতে হবে। প্রার্থীকেও নিজের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর দিতে হবে।
কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের দিন তার সংসদীয় আসন হারাবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালটে হয় না। সংসদ সদস্যদের ভোট প্রকাশ্য।
প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। ভোট দেওয়ার সময় সংসদ সদস্য ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে স্বাক্ষর করে ব্যালট সংগ্রহ করেন। এরপর যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তার নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করেন।
একাধিক প্রার্থী থাকলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল।
১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সংসদীয় পদ্ধতির রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ বিনা ভোটে দেশের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১০ জন, ১৯৮১ সালে ৩২ জন এবং ১৯৮৬ সালে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এসব নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি আবার পরিবর্তিত হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর দলীয় প্রার্থীদের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে যায়।
কারণ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও সমর্থন প্রয়োজন হয়।
এরপর থেকে সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে সাতবারই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচন, যেখানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ-দুই দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিউদ্দিন আহমদ সাংবিধানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
তার সঙ্গে আলোচনা করেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করেছেন। এবারের নির্বাচনে তিনিই নির্বাচনি কর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণের জন্য সংসদের আনুষ্ঠানিক অধিবেশন বসবে কি না। আইনগতভাবে অধিবেশন বাধ্যতামূলক নয়-এমন অবস্থান নির্বাচন কমিশনের। তবে ১৯৯১ সালের নজির এবং চিফ হুইপের বক্তব্য বলছে, এবারও ভোটের আগে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তুতি রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত অধিবেশন ডাকা হবে কি না, তা স্পষ্ট হবে ভোটের আগে সরকারের সিদ্ধান্তে। তবে অধিবেশন হোক বা না হোক, তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট বিকাল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সংসদ কক্ষেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা রেখেছে নির্বাচন কমিশন।
মন্তব্য করুন