
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলেই এসআরও নম্বর দিয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জুডিশিয়ারি সার্ভিসের ভাতা ও বেতন নির্ধারণসহ কয়েকটি বিষয়ে জটিলতা থাকায় গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২ সেপ্টেম্বর নতুন পে স্কেলের রেজল্যুশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে পাঠানো হয়। মুদ্রণ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসে। পরে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়।
বর্তমানে প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। ভেটিং শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নবম জাতীয় পে স্কেল অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের কথা জানানো হয়েছিল। তবে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা প্রকাশ হয়নি।
পে স্কেল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জুডিশিয়ারি সার্ভিসের কর্মীরা শতভাগ ভাতা চেয়েছিলেন। তবে অর্থ বিভাগ তাতে সম্মতি দেয়নি।
তার ভাষ্য, বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ সমাধান না করেই মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন ও ঘোষণা করা হয়েছে। এখন ওই জটিলতার সমাধান না করে গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশে সরকারের কোনো ধরনের বিলম্ব করার ইচ্ছা নেই। প্রক্রিয়াগত কারণে যতটুকু সময় প্রয়োজন, শুধু ততটুকুই লাগছে। দ্রুত গেজেট প্রকাশের চেষ্টা চলছে।
নতুন স্কেলে মূল বেতন কত হবে, কোন ভাতা কখন কার্যকর হবে এবং বকেয়া কীভাবে হিসাব করা হবে-এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনার জন্য সরকারি চাকরিজীবীরা গেজেটের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গেজেট প্রকাশের আগে খসড়া বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের সুযোগ নেই। বেতন নির্ধারণের নিয়ম, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা এবং অবসর সুবিধার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাই চূড়ান্ত হবে।
অর্থ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা জানান, সরকারি কর্মচারীদের দাবি অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষাভাতা, বাড়িভাড়াসহ কয়েকটি ভাতা চাহিদা অনুযায়ী না থাকায় সেগুলো বাড়ানোর দাবিও এসেছে।
এসব জটিলতা নিরসন করে আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে বলে জানান তিনি।
নতুন পে স্কেল গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়। এর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে।
এর আগে মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি চলতি সপ্তাহেই আদেশ জারির কথা জানিয়েছিলেন। তবে প্রশাসনিক ও আইনগত কিছু আনুষ্ঠানিকতার কারণে গেজেট প্রকাশে সময় লাগছে।
নতুন পে স্কেলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এ গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেতন বাড়ছে ১০০ শতাংশ।
তবে নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও পুরো বর্ধিত মূল বেতন একসঙ্গে কার্যকর হবে না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই তিন ধাপে নতুন মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে।
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ২৫ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং বাকি ২৫ শতাংশ তৃতীয় ধাপে যোগ হবে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডে বাড়তি অংশের ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে।
২০তম গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। বাড়তি ১১ হাজার ৭৫০ টাকার ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা প্রথম ধাপে যোগ হয়ে মূল বেতন দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপে আরও ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা যোগ হয়ে বেতন হবে ১৭ হাজার ৬২ টাকা ৫০ পয়সা। তৃতীয় ধাপেও একই পরিমাণ যোগ হয়ে চূড়ান্ত মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা।
প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বাড়তি ৭৮ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ হাজার ২০০ টাকা প্রথম ধাপে যোগ হয়ে বেতন হবে ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপে ২৩ হাজার ৪০০ টাকা যোগ হয়ে তা দাঁড়াবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে একই পরিমাণ যোগ হয়ে চূড়ান্ত মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
এদিকে নবম গ্রেডে বর্তমান ২২ হাজার টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে হবে ৪৪ হাজার টাকা। তিন ধাপে মূল বেতন দাঁড়াবে যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮০০, ৩৭ হাজার ৪০০ এবং ৪৪ হাজার টাকা।
চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল বেতন তিন ধাপে বাড়লেও নতুন হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা একসঙ্গে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাইয়ে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়ার পরও নতুন ভাতার পূর্ণ সুবিধা পেতে চাকরিজীবীদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। নতুন ভাতা যুক্ত হলে তাদের প্রকৃত মাসিক আয় মূল বেতনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
উদাহরণ হিসেবে, ঢাকায় নতুন করে চাকরিতে যোগ দেওয়া ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা মিলিয়ে মোট মাসিক আয় প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা হতে পারে। তবে কর্মস্থল ও প্রাপ্য ভাতার ধরন অনুযায়ী প্রকৃত আয় কম-বেশি হবে।
একইভাবে ১৩তম গ্রেডের একজন নতুন সহকারী শিক্ষক ২৪ হাজার টাকা মূল বেতন পেলে প্রযোজ্য সব ভাতা যুক্ত হওয়ার পর মোট মাসিক আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা মূল বেতন হলে ভাতাসহ মোট আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে।
নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। ঢাকায় ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে ২২ হাজার টাকা যোগ হলে শুধু মূল বেতন ও বাড়িভাড়া মিলিয়েই আয় দাঁড়াবে ৬৬ হাজার টাকা। চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ভাতা যোগ হলে মোট মাসিক আয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা হতে পারে।
বর্তমানে কর্মরত চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে হিসাবটি ভিন্ন হবে। তাদের বর্তমান মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, চাকরির মেয়াদ ও অন্যান্য সুবিধা বিবেচনা করে নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে। বেতন, ভাতা ও পেনশনসহ নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতো। তাই রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট সক্ষমতা বিবেচনায় তিন ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, কয়েক ধাপে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের ওপর একবারে বড় চাপ না দিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে অর্থ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নতুন পে স্কেলের পাশাপাশি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপরও জোর দিতে হবে।
মন্তব্য করুন