
বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে কক্সবাজার বিমানবন্দরে চালু হয়েছে দেশের প্রথম ঝিনুক আকৃতির প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল। দৃষ্টিনন্দন নকশার এই টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর)।

নতুন টার্মিনাল দিয়ে একসঙ্গে ৫০০ জন যাত্রী দেশের বাইরে যেতে এবং আরও ৫০০ জন যাত্রী দেশে প্রবেশ করতে পারবেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ২৬৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সম্প্রতি এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. ইউনুস ভূঁইয়া জানান, সোমবার থেকেই নতুন টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে প্রস্তুতি চলছে।
বঙ্গোপসাগরের একেবারে কাছেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবস্থান। বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ ফুট অংশ সাগরের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে রানওয়েটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় রানওয়েতে পরিণত হয়েছে।
অক্টোবরে সমুদ্রের জল ছুঁয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বড় আকারের উড়োজাহাজের ওঠানামা শুরু হলে পর্যটকদের ভ্রমণে নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন ঝিনুক টার্মিনাল চালুর মধ্য দিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরুর পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে এখান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কক্সবাজার দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে পর্যটন ও বাণিজ্য খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও ফুয়েলিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা বা চট্টগ্রামে নেমে সড়ক বা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কক্সবাজার যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে।
পর্যটক বাড়লে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় হস্তশিল্প ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি পর্যটন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সোমবার সকালে ঢাকা থেকে ইউএস বাংলার একটি উড়োজাহাজ কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করে। রানওয়ে থেকে নতুন টার্মিনাল দিয়ে বের হওয়ার পর রাজধানীর ফতুল্লার ব্যবসায়ী ইলিয়াছ মাতাব্বর বলেন, মেঘ ও সমুদ্রের মিতালিতে ঘেরা রানওয়েতে বিমান অবতরণের সময় তার মনে হয়েছে, উড়োজাহাজটি যেন সমুদ্রের বুকেই নামছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দূর থেকে তিনতলা টার্মিনাল ভবনটি ঝিনুকের মতো দেখায়। প্রকৌশল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে নির্মিত এই টার্মিনাল কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পকে আরও এগিয়ে নেবে বলে তিনি মনে করেন।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন জানান, সোমবার সকাল ৭টা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ঝিনুক টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান, ইউএস বাংলা, এয়ারস্ট্রা ও নভোএয়ারের মোট ৫০টি ফ্লাইট ঢাকা-কক্সবাজার রুটে যাতায়াত করেছে। এর আগের দিন ফ্লাইট ছিল ৫৪টি।
প্রাথমিকভাবে নতুন টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় যাত্রীরা সন্তুষ্ট বলেও জানান তিনি।
দুপুরে টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীরা সারিবদ্ধভাবে বিমানে ওঠার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন। কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, আবার কেউ অপেক্ষারত অবস্থায় চেয়ারে বসে সময় কাটাচ্ছেন।
নতুন টার্মিনালে আন্তর্জাতিক বহির্গমনের জন্য চারটি এবং আগমনের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার রাখা হয়েছে। লাগেজ পরিবহনের জন্য রয়েছে দুটি বেল্ট। পাশাপাশি পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে, সিসিটিভি এবং ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
যাত্রীদের সুবিধার জন্য টার্মিনালে লিফট, এস্কেলেটর ও চেক-ইন কাউন্টার স্থাপন করা হয়েছে। আগমন ও বহির্গমনের জন্য রয়েছে পৃথক ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও লাউঞ্জ।
ঢাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, তিনি তিন দিনের ভ্রমণে বৃহস্পতিবার ট্রেনে কক্সবাজার এসেছিলেন। সোমবার বিমানে ঢাকায় ফিরছেন। নতুন টার্মিনাল দেখে ভালো লেগেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভবনটি দেখতে আকর্ষণীয়। চেক-ইন, নিরাপত্তাতল্লাশি, ইমিগ্রেশন ও বোর্ডিংসহ বিমানবন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রমও সঠিকভাবে চলছে।
মন্তব্য করুন