
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্ষমতা বাড়ানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি, প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে ক্যামেরা সংযুক্ত করা এবং নির্বাচনি আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাই কমিশনের লক্ষ্য নয়; বরং ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে আয়োজনের একটি স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায় কমিশন।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে ন্যূনতম মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও উন্নত মানের নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা থাকবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই মান বজায় রাখতে কমিশন বদ্ধপরিকর।
সিইসি বলেন, একটি ভালো নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতেও যেন একই মান বজায় থাকে, সে জন্য নির্বাচনব্যবস্থায় একটি স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়ে সিইসি বলেন, কমিশনের ওপর কোনো পক্ষের চাপ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা সেভাবেই কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি গণভোট, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিং এবং প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও কারাবন্দীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরির কথাও তুলে ধরেন সিইসি।
তিনি বলেন, কমিশনের অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি নেই। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে কমিশনের পাশাপাশি প্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে। তাই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সিইসির ভাষ্য, সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া সুস্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই। নির্বাচনে জালিয়াতি হলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হয়।
সিইসি জানান, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা, নির্বাচনি কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কাজ চলছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনগতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।
ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটে। এ কারণে নির্বাচনি আচরণবিধি বাস্তবায়নে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরেও ক্যামেরা থাকবে। ফলে নির্বাচনে সহিংসতা বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে তা রেকর্ডে সংরক্ষিত থাকবে।
আচরণবিধি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে সিইসি বলেন, এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতেও কমিশনের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সিইসি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশন ও সামগ্রিক নির্বাচনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে যাওয়া সম্পর্কে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভোটার তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সিইসি জানান, এ কার্যক্রমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতে আস্থা ধরে রাখা, প্রতিটি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সব অংশীজনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপ এমন হতে হবে, যাতে মানুষ নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায় এবং অনিয়ম বা গোপনীয়তার সুযোগ না থাকে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সবার সহযোগিতা কমিশনকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করেছে।
সাংবাদিকদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের সুযোগ প্রসঙ্গে সিইসি জানান, সাংবাদিকদের জন্য কমিশনের দরজা উন্মুক্ত থাকবে। তারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।
জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র নির্বাচন কমিশন থেকে দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রেস ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা কার্যকর রাখার কথা জানিয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। নির্বাচনি অনিয়মের প্রতিকার যেন স্থানীয় পর্যায়েই দ্রুত পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় কমিশন।
কালো টাকা ব্যবহার ও ভোট কেনার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব অনিয়মের খবর পাওয়া গেলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিইসি মনে করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। রাজনৈতিক দল, প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই নিয়ম মেনে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করলে অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণ করেন। নির্বাচন না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা পরিষদসহ কয়েকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও কার্যক্রমের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা প্রয়োজন হয়। এ কারণে ইউপি নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সিইসি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরপরই পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসএসসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সময়সূচি এবং বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী থাকবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানোকে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সিইসি।
তিনি বলেন, নারী ভোটারের সংখ্যা বাড়লেও প্রার্থী হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা তুলনামূলক কঠিন। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নিরুৎসাহ, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানিমূলক প্রচারণা নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য আইনে রাখা হয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
তরুণদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে ভোটার হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তারা ভোটার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আগে বছরের ১ জানুয়ারিকে ভিত্তি ধরে বয়স গণনা করা হলেও এবার নতুন সুযোগের ফলে আরও বেশি তরুণকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও ভোটারসহ সব অংশীজনের সহযোগিতা চেয়েছেন সিইসি।
তিনি বলেন, অনিয়ম ও সহিংসতা প্রতিরোধে কমিশন সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করা কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য।
সিইসি আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও মানসম্মত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন