
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির আইন অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কীভাবে অপসারণ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিভিন্ন বিষয়ে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো এবং তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো করেছে।
এদিকে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ, অপসারণ এবং আইনি সুরক্ষার বিধান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু।
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে এই কমিশন। সংসদে প্রণীত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেন।
২০২৩ সালে অনুপ বরনওয়াল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে একটি নির্দেশনা দেন। আদালত বলেছিলেন, সংসদ এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত নিয়োগের সুপারিশ করবে একটি কমিটি। সেই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি থাকার কথা ছিল।
পরবর্তী সময়ে সংসদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার আইন, ২০২৩’ পাস হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইনটি কার্যকর হয়। নতুন আইনে নিয়োগের সুপারিশকারী কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত একটি সার্চ কমিটি নিয়োগের জন্য বিবেচনাযোগ্য পাঁচজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে।
নিয়োগের এই নতুন পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন করা হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুই বিচারপতির একটি বেঞ্চ মামলাগুলো বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে বিভক্ত রায় দেন।
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতোই সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফলে ইচ্ছামতো বা কেবল রাজনৈতিক দাবির ভিত্তিতে তাকে পদ থেকে সরানো যায় না।
প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার অভিযোগে নির্ধারিত সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে অপসারণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ১৯৬৮ সালের বিচারপতি (তদন্ত) আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।
অপসারণের প্রস্তাব লোকসভা ও রাজ্যসভা-সংসদের উভয় কক্ষেই বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে হবে। শুধু একটি কক্ষে প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না। দুই কক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ জারি করতে পারেন।
তবে অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে বিধানটি ভিন্ন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ছাড়া তাদের পদ থেকে অপসারণ করা যায় না।
২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় বর্তমান ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে দায়িত্ব পালনের সময় গৃহীত পদক্ষেপ, সম্পাদিত কাজ কিংবা দেওয়া বক্তব্যের জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যক্রম থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তবে আইনের এই ধারায় গ্রেপ্তার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ-এমন কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। একইভাবে তদন্ত বা পুলিশি হেফাজতের বিষয়েও সরাসরি কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এই আইনি সুরক্ষাকে সব ধরনের পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এ ছাড়া সুরক্ষার পরিধি মূলত তাদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তাও আইনে দেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জন্য সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা থাকলেও তা কোন পরিস্থিতিতে কতটুকু প্রযোজ্য হবে, সে ক্ষেত্রে আইনের নির্দিষ্ট বিধান বিবেচনা করতে হয়।
মন্তব্য করুন