skynews
১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বিএনপি সরকারের ছয় মাসে প্রশাসনে কতটা শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরেছে-এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

বিএনপি সরকারের ছয় মাসে প্রশাসনে কতটা শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরেছে-এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হচ্ছে, নাকি আগের সরকারের মতোই দলীয় পরিচয় গুরুত্ব পাচ্ছে-এ নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

বিএনপি সরকারের ছয় মাসে প্রশাসনে কতটা শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরেছে-এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

বাংলাদেশের প্রশাসনে দলীয়করণের ইতিহাস দীর্ঘ। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, অনেক ক্ষেত্রেই দক্ষতার চেয়ে দলীয় মতাদর্শের কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পদায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, গত ২০ থেকে ২৫ বছরে আমলাতন্ত্র মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়েছে-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতপন্থী হিসেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, প্রশাসনে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর প্রশ্ন, সরকার গঠনের পর প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএনপি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কতটা শিক্ষা নিয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। তবে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই কমিশনের সুপারিশও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘদিন অবসরে থাকা বিএনপি ও জামায়াতঘরানার কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে এনে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি সরকারের সময়েও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৭৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন, যাদের দলীয় মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৭০-এর বেশি কর্মকর্তা ওএসডি হয়ে কর্মহীন রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিনের বক্তব্য, ফ্যাসিবাদী সরকারকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাতে যারা ভূমিকা রেখেছিলেন এবং বারবার মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করেছেন, তাদের সরিয়ে দেওয়াই জনগণের প্রত্যাশা।

তবে সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, প্রশাসন পরিচালনায় ভারসাম্য জরুরি। তাঁর মতে, আগের আমলে বঞ্চিতদের মধ্যে যারা যোগ্য ও ভালো কর্মকর্তা, তাদের যেমন কাজে লাগাতে হবে, তেমনি আগের সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা যোগ্য কর্মকর্তাদেরও বাদ দেওয়া উচিত নয়।

See also  হাসিনার ১৬ বছরের শাসনে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ ‘ক্রসফায়ারে’ নি*হ*ত: আইনমন্ত্রী

সম্প্রতি ১২টি অধিদপ্তর ও করপোরেশনে নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় পদধারীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ এখনও দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেননি। বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের মতে, দলীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করা কঠিন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮২৯ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময় যে নীতি চালু হয়েছিল, তাতে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন প্রশাসনে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পেতেন। তবে ১৮৮৩ ও ১৯৭৮ সালে দুই দফা সংস্কারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সেই ব্যবস্থা থেকে সরে আসে।

জিমি কার্টারের সময় প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ মেধা এবং ৩৫ শতাংশ দলীয় নিয়োগের বিধান করা হয়। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে, তা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই কাঠামোই বারবার দুর্বল হয়ে পড়ে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দলীয় পরিচয় থাকা নিজে বড় সমস্যা নয়, যদি নিয়োগ হয় দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে। মূল সংকট তৈরি হয় যখন অদক্ষতা, অনিয়ম ও রাজনৈতিক আনুগত্য যোগ্যতার জায়গা দখল করে।

অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা নিজেদের সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারী খুঁজতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই কৌশল সংশ্লিষ্ট দল বা সরকারের জন্যও সুফল বয়ে আনে না।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সামনের দিনগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্তদের কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা করা হবে। তাঁর দাবি, প্রশাসন আগের তুলনায় আরও নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।

See also  পে স্কেলের গেজেট আটকে কেন, জানালেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা

ফলে বিএনপি সরকারের ছয় মাসে প্রশাসনে দলীয়করণের চেহারা বদলেছে কি না, নাকি পুরোনো সংস্কৃতিই নতুনভাবে ফিরে এসেছে-এই প্রশ্নের উত্তর পেতে সামনে আরও সময় ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শাপলা চত্বরের শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সম্মান: আসিফ মাহমুদকে মামুনুল হকের কৃতজ্ঞতা

গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা আলামিনের মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

বন্ধ ও অস্তিত্বহীন চালকল থেকেও চাল কিনছে সরকার, রায়গঞ্জে অনিয়মের অভিযোগ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি দেশের ভয়ে গড়িমসি: আজহারুল ইসলাম

আনিসুল হকের বিরুদ্ধে ১৭২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের চার্জশিট

র‍্যাব বিলুপ্ত, নতুন নামে যাত্রা শুরু এসআরবির

ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে মন্তব্য: দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন

সাতকানিয়ায় যুবক হ*ত্যা: বিএনপি-যুবদল-ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ গ্রেপ্তার ১২

চার দিনের সফরে জাপান গেলেন সেনাপ্রধান

বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের ষড়যন্ত্র চলছে: রিজভী

১০

আমির হামজার বিরুদ্ধে মানহানি মামলার হুঁশিয়ারি ফরিদা ইয়াসমিনের

১১

মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক তারে কাপড়, ৩৯ মিনিট বন্ধ ছিল ট্রেন

১২

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বিদেশিদের সাইবার অপরাধ, বাংলাদেশ কি নতুন ঘাঁটি?

১৩

স্থানীয় সরকার আইনে এককভাবে নির্বাচনের সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৪

রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনা বয়কট মহানগর বিএনপির

১৫

মৃ*ত্যু*দণ্ডের পাশাপাশি কাদেরসহ ৫ আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

১৬

সিলেটে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল, বিকেলে নাগরিক সংবর্ধনা

১৭

ইউপি ভোট নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যে ইসির নো কমেন্টস, ১৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত হবে সিদ্ধান্ত

১৮

শহীদ দুই সেনাসদস্যের পরিবার পাবে বাড়ি, চাকরি ও মাসিক ভাতা

১৯

লালমাটিয়ায় সাবেক এমপি আজিজুল হক আটক, পরে গ্রেপ্তার

২০