ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের দাবিতে যশোরে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ঘেরাও ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন সহস্রাধিক মানুষ।

সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচির আয়োজন করে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।
অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পানিবন্দি নারী-পুরুষ মাথায় মাথাল, কাঁধে লাঙল, মই ও নিড়ানি, হাতে জাতীয় পতাকা এবং বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করে ডিসি কার্যালয়ে জড়ো হন। কর্মসূচিজুড়ে তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, অসংখ্য প্রতিশ্রুতি ও নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি। চলতি বর্ষায় টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে আবারও যশোরের ভবদহ ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক ডুবে গিয়ে লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
মনিরামপুর উপজেলার পদ্মনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, বন্যার পানিতে তাঁর মাছের ঘের ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। একমাত্র বসতঘরেও পানি ঢুকে পড়েছে। উঠানে কোমরসমান এবং রান্নাঘর ও গোয়ালঘরে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। সাপ ও পোকামাকড়ের ভয়ে স্ত্রী-সন্তান এবং অসুস্থ মাকে নিয়ে তিনি উঁচু সড়কের পাশে অস্থায়ী পলিথিনের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, সরকার বদলালেও ভবদহের মানুষের দুর্ভোগের শেষ হচ্ছে না। আমডাঙ্গা খাল খনন এবং বিল কপালিয়ায় টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) চালু না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এর আগে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি জলাবদ্ধতা নিরসনে চার দফা দাবি উত্থাপন করে। গত ২৬ জুলাই জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানিসম্পদমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। সেখানে দাবি বাস্তবায়ন না হলে ৩ আগস্ট ডিসি কার্যালয় চত্বরে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
সংগঠনটির চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—জরুরি ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খাল সংস্কার সম্পন্ন করে বিলম্বের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, খর্ণিয়া দক্ষিণ পাশের বাঁধসহ সব অস্থায়ী বাঁধ অপসারণ এবং খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত নদীর পলি অপসারণ, আইডব্লিউএমের সুপারিশ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে টিআরএম বাস্তবায়ন ও নদী খননের সঙ্গে সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ এবং পানিবন্দি মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, অসম্পূর্ণ নদী খনন, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা এবং পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতার কারণে ভবদহের জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে ১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প নতুন আশার সঞ্চার করলেও কয়েক দিনের টানা বর্ষণেই সেই আশা ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমানে দুই শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, নদী খননের পাশাপাশি টিআরএম বাস্তবায়ন ছাড়া ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বর্তমান সংকট শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, সরকারের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলীয়ভাবে ভবদহ এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। তিনি জানান, যশোরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন এবং ভবদহের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁর আশা, বর্তমান সরকারের উদ্যোগে যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ লাঘব হবে।
মন্তব্য করুন