
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বেজে উঠেছে বিদায়ের সুর। মহানবমীর সন্ধ্যায় আরতি শেষে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভূতি। বুধবার বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গার মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাশে স্বামীগৃহে ফিরে যাওয়ার কথা। তাই উৎসবের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে আসতেই ভক্তদের মনে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।

মঙ্গলবার সকালে নবমীর বিহিত যজ্ঞ ও পূজার মধ্য দিয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, নবমী তিথিতে রাবণ বধের পর রাজা শ্রী রামচন্দ্র এ পূজা করেছিলেন। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনায় এদিন জাতীয় মন্দিরে ভক্তদের সমাগম ঘটে।
সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ষোড়শোপচারে পূজা, নবপত্রিকা ও দর্পণ স্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। পরে ১০৮টি বেলপাতা, আমকাঠ ও ঘি দিয়ে যজ্ঞের মাধ্যমে দেবীর উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হয়। অঞ্জলি নিবেদনের পর ভক্তরা চরণামৃত ও যজ্ঞের ফোঁটা সংগ্রহ করেন।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সহকারী পুরোহিত সৌম্যদীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, নবমী পূজাকে ‘ভরা পূজা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবী দুর্গার ১৫ কলার সঙ্গে মহাদেবের এক কলা যুক্ত হয়ে তাঁর ১৬ কলা পূর্ণ হয়। মহাদেবের সঙ্গে এই সংযোগ দেবীর আধ্যাত্মিক ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতীক। সেই শক্তিতেই বিজয়া দশমীতে দেবী মহিষাসুরকে বধ করবেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
মহানবমীর তাৎপর্য তুলে ধরে মন্দিরের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী বলেন, এ পূজার মূল উদ্দেশ্য অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে এসেছেন এবং নৌকায় চেপে ফিরে যাবেন। এর সঙ্গে পৃথিবী শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠার প্রত্যাশা জড়িয়ে রয়েছে। ভক্তরা দেবীর কাছে পৃথিবীর সব ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হওয়া এবং সবার সুখ-শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করেন।
পূজা, অঞ্জলি ও ভোগ নিবেদনের পাশাপাশি দিনভর ভক্তদের পদচারণায় মুখর ছিল মন্দির প্রাঙ্গণ। তবে দশমীর বিদায়বেলার কথা ভেবে অনেকের মনেই ছিল বিষণ্নতা।
পূজা দেখতে আসা নিপা রায় বলেন, নবমীতে একদিকে আনন্দ হয়, অন্যদিকে মনে হয় উৎসব শেষ হয়ে আসছে। কারণ দশমীতেই দেবীকে বিদায় জানাতে হবে। তাঁর ভাষায়, নবমী হলো আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতির দিন।
আড়াইহাজার থেকে আসা মালিনী ষষ্ঠী থেকেই পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত রয়েছেন। নবমীতে মন্দিরে আসা ভক্তদের তিলক পরিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় কাজ করায় বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়লেও মন্দিরের কাজে তাঁর বিরতি নেই।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মালিনী বলেন, এখন তাঁর ভালো লাগছে না। দুই চোখের জল ফেলতে ইচ্ছা করছে। মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে একটু আলিঙ্গন করে তাঁর সঙ্গে চলে যেতে চান, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
মহানবমী উপলক্ষে দুপুর ১টায় ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম মন্দিরের প্রধান ফটকের উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মন্দিরের মূল নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফটকটি আধুনিকভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মন্দির পরিদর্শনে আসেন। তাঁদের মধ্যে গণফোরাম, বাসদ ও জাসদের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
নবমীর রাতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আরতি প্রতিযোগিতা। ঢাকের তালে আরতি ও নৃত্য পরিবেশনার দক্ষতা যাচাইয়ের এ আয়োজনে ৩০ থেকে ৪০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। তিন সদস্যের বিচারকমণ্ডলী তাঁদের পরিবেশনা মূল্যায়ন করেন। প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের ট্রফি ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন কমিটি।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। মন্দির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ বছর আগে বল্লাল সেনের শাসনামলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণে এক ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমাকে ঘিরে আদি পূজার ঐতিহ্য চলে আসছে।
দেশভাগের সময় আদি প্রতিমাটি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেটি কলকাতার কুমারটুলিতে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দিরে রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে ১৯৭৮ সাল থেকে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
টানা পাঁচ দিনের উৎসব শেষে বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। এদিন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রায় ৫০ বছর ধরে চলে আসা রক্তদান কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হবে।
বুধবার সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে পূজা ও দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয়ভাবে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি তাপস কুমার পাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সকাল ১১টায় দেবীকে বরণ করা হবে। দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত হবে সিঁদুর খেলা। এ সময় বিবাহিত নারীরা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে আনন্দ-উৎসবে অংশ নেবেন।
তিনি আরও জানান, বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন রয়েছে। এ অনুষ্ঠানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশ নেবেন।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
তাপস কুমার পাল বলেন, বিকেল ৪টার দিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা শুরু হবে। শোভাযাত্রাটি পলাশী, জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে ওয়াইজঘাটে পৌঁছাবে।
রাতে ওয়াইজঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
মন্তব্য করুন