
শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সময়ে টিকার সরবরাহেও তৈরি হয় চরম ঘাটতি।
বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ, এই বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। ফলে অতিসংক্রামক হামের ভাইরাসটি সহজেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের এমন বিধ্বংসী রূপ নেওয়ার পেছনে অদূরদর্শী সিদ্ধান্তও দায়ী। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্বল নজরদারি এবং টিকা ক্রয় নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু এই অতিসংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে।
সোমবার জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, টিকা ক্রয়নীতি পরিবর্তনের কারণেই বাজারে টিকার চরম সংকট তৈরি হয়েছিল।
তিনি জানান, ২০২৪ সালে টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাতিল করার প্রভাব এখন শিশুদের ওপর পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও টিকাদানের ঘাটতিকেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বছরের পর বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িকভাবে এই হার কমে যাওয়া ছাড়া হাম নির্মূলের পথেই এগোচ্ছিল দেশ।
তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতির কারণে সেই অগ্রগতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় হাম নির্মূলের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ।
হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ উল্লেখ করে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা তার জানা মতে আগে কখনো ঘটেনি। একইভাবে এক বছরে এতসংখ্যক হাম রোগী দেখার অভিজ্ঞতাও এর আগে হয়নি।
তিনি বলেন, এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই পরিস্থিতির বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা।
মন্তব্য করুন