
বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে কলা পাকানো, অনিরাপদ ড্রামে ভোজ্যতেল রাখা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সোমবার ঢাকা মহানগরসহ ২৮টি জেলায় পরিচালিত এ অভিযানে ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কলা এবং অনিরাপদ ড্রামে রাখা প্রায় ২০৪ লিটার সয়াবিন তেল জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অধিদপ্তরের ৩৬টি দল এ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করে। অভিযানের আওতায় পাইকারি ও খুচরা বাজার, ফলের আড়ত, ভোজ্যতেলের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
কুমিল্লায় রাসায়নিক দিয়ে কলা পাকানোয় জরিমানা
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার স্টেশন রোড ও রেইসকোর্স এলাকায় অভিযান চালায় জেলা কার্যালয়ের একটি দল। সহকারী পরিচালক মো. কাউছার মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে অপরিপক্ব কলা পাকানোর দায়ে ‘হালিমের কলার আড়ত’কে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কলাগুলো জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়।
এদিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডাব ও কলার আড়তে অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান। কলা পাকানোর রাসায়নিক সংরক্ষণের দায়ে সেখানে একটি আড়তকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম না করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে সতর্ক করা হয়েছে।
অনিরাপদ ড্রামে সয়াবিন তেল সংরক্ষণ, জরিমানা ২ লাখ ১০ হাজার টাকা
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কৃষি মার্কেটে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রির দোকানগুলোতে তদারকি চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ ড্রামে তেল সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় লেবেল না থাকার বিষয়টি শনাক্ত করা হয়। এসব অনিয়মের দায়ে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এর মধ্যে মেসার্স সততা স্টোরকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ইউরিয়া ফরমালডিহাইডের ড্রামে রাখা আনুমানিক ২০৪ লিটার সয়াবিন তেল জনসম্মুখে নষ্ট করে দেওয়া হয়। একই অভিযানে হেলাল জেনারেল স্টোরকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
রাজধানীতে ডাব বিক্রিতে অনিয়ম, চার প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুস সালামের নেতৃত্বে সাদেক খান কৃষি মার্কেটের ডাবের আড়ত এবং কলেজ গেট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনের ডাবের দোকানগুলোতে অভিযান চালানো হয়।
এ সময় ডাবের সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য, পাকা রসিদ সংরক্ষণ এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়। ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ না করা, ট্রেড লাইসেন্স না থাকা এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে চারটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ আদায়ও করা হয়েছে।
দাম, ওজন ও পণ্যের মান যাচাইয়ে দেশজুড়ে নজরদারি
দেশব্যাপী অভিযানে ডাব, কলাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়া, হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, ওজন ও পরিমাপে কারচুপি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ও ওষুধ বিক্রি এবং নকল বা ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হয়।
অভিযান থেকে ব্যবসায়ীদের ফল ও খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা নিষিদ্ধ দ্রব্য ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যৌক্তিক দামে পণ্য বিক্রি, সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করা এবং ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বাজারে মজুতদারি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি না করতেও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে।
তদারকির পাশাপাশি ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট ও প্যাম্ফলেট বিতরণ করা হয়। এ কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প ও বণিক সমিতির প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেন।
অনিয়মের অভিযোগ জানাতে হটলাইন ১৬১২১
ভোক্তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য না কেনার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরামর্শ, পণ্য কেনার আগে মূল্যতালিকা, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ওজন ও পরিমাপ যাচাই করে নিতে হবে। কেনাকাটার পর বিক্রেতার কাছ থেকে রসিদ সংগ্রহের বিষয়েও সচেতন থাকতে বলা হয়েছে।
পণ্য কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, ভেজাল, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের শিকার হলে অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারবেন ভোক্তারা।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ন্যায্যমূল্যে পণ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে দেশজুড়ে এ ধরনের বিশেষ বাজার তদারকি অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্য করুন