
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এটি হবে দ্বিতীয় আয়োজন। তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী কতজন হচ্ছেন-দুই নাকি তিনজন-তা এখনো নিশ্চিত নয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৪টা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, এদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের জন্য এখন পর্যন্ত তিনটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অন্য একটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
তিনটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ হওয়ায় অনেকে ধারণা করছেন, রাষ্ট্রপতি পদে তিনজন প্রার্থী হতে পারেন। তবে বাস্তবে প্রার্থী সংখ্যা তিন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রার্থীই দেবে। দলীয় সূত্র বলছে, দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হওয়ার পথে। যদিও আরও দুই-একজনের নাম নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারেন।
ইসি সূত্র জানায়, একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মূলত একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ধরনের ভুল বা ত্রুটি থাকলে বিকল্পটি যেন বিবেচনায় নেওয়া যায়, সে কারণেই এই ব্যবস্থা। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও একইভাবে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

গত রোববার জোটের বৈঠক শেষে নেতারা অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেন। পরদিন সোমবার জোটের পক্ষে নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
ফলে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদ-এই দুইজনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনাই এখন বেশি।
রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রার্থী থাকলে এবং যাচাই-বাছাইয়ে তার মনোনয়নপত্র বৈধ হলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। নির্বাচন কমিশন তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করবে।
তবে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হলে তাদের নাম চূড়ান্ত করে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করবে কমিশন। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের অধিবেশন না থাকলে বিশেষ অধিবেশন ডাকার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি জানিয়েছেন, ওই অধিবেশন স্বল্পমেয়াদি হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি সংসদ সদস্যদের ভোট হয়েছিল একবার, ১৯৯১ সালে। ওই বছর বিএনপি সরকার গঠনের পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যসহ মোট ৩৩০ জন ভোটার থাকার কথা থাকলেও ভোট দেন ২৬৪ জন। ভোটদানে বিরত ছিলেন ৬৬ জন সংসদ সদস্য।
নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
এরপর গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট হবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে।
একজন প্রার্থী একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। তবে যাচাই-বাছাই শেষে একটি মনোনয়নপত্রই চূড়ান্তভাবে বিবেচিত হবে।
২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। ভোটের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও থাকবে।
ইসি জানিয়েছে, ভোটার হিসেবে সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষের নিজ নিজ আসনে অবস্থান করবেন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন।
প্রতিটি ব্যালট পেপারে থাকবে দুটি অংশ-মুড়ি ও মূল ব্যালট। মুড়ি অংশে প্রার্থীর ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর এবং স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত ঘর থাকবে।
মূল ব্যালটের ডান পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে। ভোটার সংসদ সদস্য পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে তার পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন।
সংসদ সদস্যদের সুবিধার জন্য অধিবেশন কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখা হবে। ভোটাররা যেকোনো একটি বাক্সে তাদের ব্যালট পেপার জমা দিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব।
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর অধিবেশন কক্ষের ভেতরেই ব্যালট বাক্সের সামনে ভোট গণনা শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত চার বা পাঁচ সদস্যের একটি ব্যালট গণনা দল ব্যালট পেপার বাছাই ও গণনার কাজ সম্পন্ন করবে।
মোট ৩৪৯টি ব্যালটের মধ্যে কতটি বৈধ ও কতটি বাতিল হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কে কত ভোট পেয়েছেন-এসব তথ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) তথা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনকর্তা অধিবেশন কক্ষেই সরাসরি ঘোষণা করবেন।
পরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এসে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হবে।
ফলে তিনটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ হলেও রাষ্ট্রপতি পদে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী দুইজন নাকি একজন থাকছেন, তা নিশ্চিত হবে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর।
মন্তব্য করুন