
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের একটি আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, বিষয়টি আইনগত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং এর সঙ্গে আদালতও সম্পৃক্ত। তাই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।

শনিবার ‘বে অফ বেঙ্গল কনভার্সেশন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত এক সেশনে প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। একই প্রসঙ্গে ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরত দেওয়ার বিষয়েও একই ধরনের প্রক্রিয়ার কথা জানান ভারতীয় হাইকমিশনার।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এরই মধ্যে একাধিকবার ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়াটি আইনগত ও সুসংগঠিত। বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া চলমান এবং আদালতও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।’
শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, এ প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, তাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে সে সময় যে মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ভারতে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘সেই সময় একটি সামরিক বিমান ভারতে এসেছিল এবং ভারতও এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমি নিজেও তখন টেলিভিশনে দেখছিলাম, স্ক্রলে প্রচার করা হচ্ছিল যে তিনি অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন।’
তার ভাষ্য, ওই সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ফলে পরিস্থিতির বাস্তবতায় ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, একজন প্রতিবেশী হিসেবে তখনকার বাস্তবতা গ্রহণ করাই ভারতের দায়িত্ব ছিল। ভারত যদি তাকে গ্রহণ না করত, এমনকি অবতরণের অনুমতিও না দিত, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত তা বলা কঠিন।
তিনি বলেন, এটিই ছিল সেই সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি নিজস্ব গতিতে চলছে। বাংলাদেশ যেমন একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকে সম্মান করে, ভারতও একইভাবে তার আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান করে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি তারা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো বোঝে। বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা বলে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। একইভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপের প্রশ্নও আসে না। বাংলাদেশের জনগণের ওপর ভারতের পূর্ণ আস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যে সম্পর্কই বজায় রাখুক, নিজেদের জনগণের স্বার্থ রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে ভারতেরও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অধিকার রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু লেনদেনের সম্পর্ক হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। এর সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তিনি ভালোভাবে বোঝেন। দুই দেশের এ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ও মৌলিক।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাইরের বিশ্বের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। একদিকে নজরুলগীতি, অন্যদিকে রবীন্দ্রসংগীত। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। এসব বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে।
নিরাপত্তা সম্পর্ক ও লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক এক নয় উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং তারা ভারতের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বোঝেন। ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে না বলেও তিনি মনে করেন, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগের কারণ সৃষ্টি হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে মতপার্থক্য প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, একটি পরিবারের মতো দুই দেশের সম্পর্কেও কখনো কখনো সমস্যা বা মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। তার মতে, গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবেই।
তবে এসব সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে তিনি সংলাপ, আলোচনা, পরামর্শ ও পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেন। আর এসবের ভিত্তি হলো আস্থা।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দূরত্ব রেখে কোনো সম্পর্কের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময়ই একটি চলমান প্রক্রিয়া। দুই দেশের মানুষের ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা তিনি দেখতে পাচ্ছেন। এ কারণে দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি অটুট রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
মন্তব্য করুন