
অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে ফেসবুক লাইভে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দাবি করেছেন, রাজনৈতিক ক্ষোভ মেটানো এবং তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে। তার আশঙ্কা, অনুসন্ধান শেষে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ততদিনে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দুদকের অনুসন্ধানে ভবিষ্যতে তাকে নিরপরাধ পাওয়া গেলেও ততদিনে তার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জনমত বা ‘পাবলিক পারসেপশন’ রাজনৈতিকভাবে ক্ষতি করে ফেলবে। তার ভাষ্য, রাজনীতি অনেকটাই পারসেপশনের ওপর নির্ভরশীল। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগকে সামনে এনে গণঅভ্যুত্থান এবং এর নেতাদের নিয়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা চলছে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এনসিপির এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, তিনি এমন কোনো কাজ করেননি, যা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কিংবা বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তার অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সময় লেগে গেলে তার আগেই এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে তাকে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিকভাবে তাকে ও তার পরিবারকে হয়রানি করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা জানান আসিফ মাহমুদ। তার মতে, একটি নির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করে রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা সম্ভব।
দুদকের অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারের আশপাশে থাকা এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন-এমন কয়েকজনের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে তার ধারণা হয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষোভ মেটাতেই তার বিরুদ্ধে এসব কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, সরকারের দায়িত্বে থাকার সময় তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের নেতা অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাদের সেই অসন্তোষ থেকেই প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে পুরো প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে তার মনে হয়নি যে এই অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা।
অভিযোগগুলো নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে এগুলোকে সংবাদ কনটেন্ট হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি শুরু থেকেই লক্ষ্য করছেন।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে আসিফ মাহমুদ বলেন, চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার এক টাকা দেশের বাইরে পাওয়া গেলেও তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। তার দাবি, তিনি দেশের বাইরে কোনো অর্থ বিনিয়োগ করেননি এবং দেশের বাইরে নিজের নামে কোনো সম্পদও কেনেননি।
নিজের জাতীয়তাবোধের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেউ যদি তাকে দেশের বাইরে গিয়ে আরামে জীবনযাপন করার সুযোগের বিনিময়ে ১০ বছর কারাদণ্ড এড়ানোর প্রস্তাব দেয়, তবুও তিনি কারাভোগকেই বেছে নেবেন।
অভিযোগে তার দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন আসিফ মাহমুদ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার দুই ভগ্নিপতি নেই; তার বড় বোন বিবাহিত এবং তার একজন ভগ্নিপতি রয়েছেন। আর যে ভাগ্নের কথা বলা হয়েছে, তার বয়স আড়াই থেকে তিন বছর। এমন একটি শিশুকেও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের সঙ্গে জড়ানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, আড়াই থেকে তিন বছর বয়সী একটি শিশুর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ তোলা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা এখন গণঅভ্যুত্থানের বিরোধীদের ন্যারেটিভ অনুসরণ করে তাদের দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।
এ সময় জনগণকে কোনো অভিযোগের বিষয়ে একতরফা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আসিফ মাহমুদ বলেন, শুধু ক্লিকবেইট শিরোনাম দেখে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা উচিত এবং তাকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
সরকার ও ক্ষমতাসীনদের বক্তব্যও যাচাই করে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা সরকারের বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনও সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
মন্তব্য করুন