
মালয়েশিয়ায় স্বল্প বেতনভোগী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৭ সালের বাজেট ঘোষণার আগে বর্তমান ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত থেকে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ২ হাজার রিঙ্গিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ন্যূনতম মজুরি আরও বাড়িয়ে ৩ হাজার ১০০ রিঙ্গিত করা হোক।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার কাছাকাছি। নতুন মজুরির হার কত হবে এবং তা কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রী আকমান নাসরুল্লাহ মোহাম্মদ নাসির জানিয়েছেন, ন্যূনতম মজুরি ২ হাজার রিঙ্গিত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ২০২৭ সালের বাজেট ঘোষণার সময় জানাবেন। তবে মজুরি বাড়ানোর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও এমএসএমই খাতের টিকে থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মারার সাবেক শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন বিলিয়ন রিঙ্গিত মুনাফা করবে, অথচ শ্রমিকরা ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত বেতন পাবেন—এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উৎপাদনশীলতা ও কোম্পানির আয় বাড়লে শ্রমিকদেরও উচ্চ মজুরির মাধ্যমে সেই সুফল পাওয়া উচিত। এ বিষয়ে আসন্ন বাজেটে কিছু উদ্যোগ ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
মালয়েশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি ব্যবস্থা চালু হয় ২০১৩ সালে। তখন মাসিক ন্যূনতম মজুরি ছিল ৯০০ রিঙ্গিত। এরপর ২০১৬ সালে ১ হাজার, ২০১৯ সালে ১ হাজার ১০০, ২০২০ সালে ১ হাজার ২০০, ২০২২ সালে ১ হাজার ৫০০ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত করা হয়।
২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটিতে ন্যূনতম মজুরি বেড়েছে প্রায় ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বর্তমান ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতের হার ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্দিষ্ট শ্রেণির নিয়োগকর্তার ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। পরে ১ আগস্ট থেকে কর্মীর সংখ্যা নির্বিশেষে দেশজুড়ে এটি কার্যকর করা হয়। তবে গৃহকর্মীরা এই মজুরি কাঠামোর আওতাভুক্ত নন।
মালয়েশিয়ার ন্যূনতম মজুরি আইন বিদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে বাংলাদেশ, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের যোগ্য বিদেশি শ্রমিকরাও স্থানীয় আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম মৌলিক মজুরি পাওয়ার অধিকার রাখেন।
বর্তমান নিয়মে বিদেশি শ্রমিকদেরও অন্তত ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত বেসিক বেতন দেওয়ার কথা। নতুন ন্যূনতম মজুরি ২ হাজার রিঙ্গিত নির্ধারণ করা হলে যোগ্য বিদেশি শ্রমিকদের বেসিক বেতনও সেই হারে বাড়বে।
মালয়েশিয়ায় প্রায় ৪ লাখ নেপালি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। ন্যূনতম মজুরি বাড়লে তারাও সরাসরি এর সুবিধা পাবেন।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশি ও নেপালি শ্রমিক জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় বর্তমানে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাবারসহ অন্যান্য খরচ মেটানোর পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তা তারা দেশে পাঠান। তবে নিয়মিত ওভারটাইম না থাকলে সঞ্চয় করা কঠিন বলে জানান তারা।
সরকার যখন ন্যূনতম মজুরি ২ হাজার রিঙ্গিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে, তখন মালয়েশিয়ান ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (এমটিইউসি) ৩ হাজার ১০০ রিঙ্গিত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। বর্তমান ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতের তুলনায় প্রস্তাবিত এই হার ৮২ শতাংশেরও বেশি।
ইতোমধ্যে কিছু সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ও সরকারি বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মাসিক ৩ হাজার ১০০ রিঙ্গিতকে ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে সরকার এখনো এটিকে আইনগত ন্যূনতম মজুরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব করেনি।
১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত থেকে সরাসরি ৩ হাজার ১০০ রিঙ্গিতে মজুরি বাড়ানো হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শ্রম ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সীমিত মুনাফায় পরিচালিত ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ রয়েছে। এর প্রভাব পণ্যের দাম এবং নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আকমান নাসির বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে মজুরি বাড়াতে হলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তার মতে, মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতারও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার আইনে অন্তত দুই বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার বিধান রয়েছে। এ সময় জাতীয় মজুরি পরামর্শ কাউন্সিলকে ন্যূনতম মজুরির ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রভাব মূল্যায়ন করতে হয়।
২০২৭ সালের বাজেটের প্রাক-বাজেট বিবৃতিতেও সরকারের ‘ডিসেন্ট ওয়েজ এজেন্ডা’ বা মর্যাদাপূর্ণ মজুরি কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত। একই সঙ্গে সরকারি মালিকানাধীন বিনিয়োগ কোম্পানি ও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ হাজার ১০০ রিঙ্গিতকে জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে।
মালয়েশিয়ার ১৩তম পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে উচ্চ আয় ও উচ্চ উৎপাদনশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে বিদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে বেতনের ওপর মালয়েশিয়ার কর্মচারী ভবিষ্যৎ তহবিল (ইপিএফ)-এ নিয়োগকর্তা ও বিদেশি শ্রমিক উভয়কেই ২ শতাংশ করে অবদান রাখতে হচ্ছে।
মন্তব্য করুন