
মাত্র ১০ টাকায় প্রথম কেজি এবং পরবর্তী প্রতি কেজিতে ৫ টাকা খরচে পার্সেল পরিবহনের সেবা দিচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ‘স্পিড পোস্ট’। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ফ্রিজ, টেলিভিশন, আসবাব, ফলমূল, মাছ-মাংস এমনকি মোটরসাইকেলও পাঠানো যাচ্ছে এ সেবার মাধ্যমে। রাজধানী ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এবং দূরবর্তী জেলা বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগোচ্ছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠান।

‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ ৯ অক্টোবর দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডাক দিবস। এ উপলক্ষে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘ডাকসেবা সপ্তাহ’ পালন করবে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ফিলাটেলিক প্রদর্শনী ও ডাকসেবা বিষয়ক মেলার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া ৯ ও ১০ অক্টোবর ছুটির দিনেও ডাক বিভাগের সব পর্যায়ের কার্যালয়ে সঞ্চয় ব্যাংক কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য ডাকসেবা চালু থাকবে।
বিশ্ব ডাক দিবস ২০২৬ এমন সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন ঐতিহ্যবাহী ডাকসেবার পাশাপাশি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব ডাক এবং লজিস্টিকস সেবা গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং, পোস্ট পিকআপ ও ডেলিভারি, ফুলফিলমেন্ট সেন্টার, কৃষিপণ্য ও মৌসুমি ফল পরিবহন এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর মাধ্যমে সেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।
স্পিড পোস্টে বাড়ছে পণ্য পরিবহন
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষক এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এ সেবা।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পার্সেল পরিবহনেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিবহন বেড়েছে ৭৩ টন বা প্রায় ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
ডাক বিভাগের দাবি, স্পিড পোস্টের মাধ্যমে সেবাটিকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা চলছে। একসময় যেসব পণ্য পরিবহনের জন্য বেসরকারি কুরিয়ারের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেগুলোর অনেক কিছুই এখন ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো যাচ্ছে।
ফ্রিজ থেকে মোটরসাইকেল, পাঠানো যাচ্ছে নানা পণ্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্পিড পোস্টের মাধ্যমে ফ্রিজ, আলমারি, ওয়ার্ডরোব, বড় আসবাব, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, প্রেসার কুকার, ইন্ডাকশন কুকার, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল ও কীটনাশক ছিটানোর যন্ত্র পরিবহন করা হচ্ছে। উদ্যোক্তারা পাঠাচ্ছেন মৌসুমি ফল, মাছসহ বিভিন্ন পণ্য। শিক্ষার্থীরাও বইপত্র, লেপ-তোশক ও বিছানাপত্রের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাচ্ছেন।
এ বছর শুধু ফলের মৌসুমেই প্রায় ৩৫০ মেট্রিক টন ফল পরিবহন করা হয়েছে। আমের পাশাপাশি রংপুর ও দিনাজপুরের লিচু, মধুপুরের আনারস, পাহাড়ি এলাকার ড্রাগন ফল, বরিশালের সুপারি, কক্সবাজারের শুঁটকি, খুলনা অঞ্চলের মাছ এবং পার্বতীপুর থেকে কাঁচা মাংসও পাঠানো হচ্ছে। বিশেষভাবে প্যাকেটজাত করে রান্না করা খাবার পাঠানোর ঘটনাও রয়েছে।
ডাক বিভাগের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৮ সালে স্পিড পোস্ট চালু হলেও বিভিন্ন লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তখন প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। এখন নতুনভাবে সেবাটিকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দূরবর্তী জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ কাজে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা লাগছে। তবে বড় পার্সেল এখনো সরাসরি গ্রাহকের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয় না। সংশ্লিষ্ট পোস্ট অফিস থেকে গ্রাহককে তা সংগ্রহ করতে হয়। পার্সেল পৌঁছানোর পর ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহককে জানানো হয়। ভবিষ্যতে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
পাঁচ কেজির পার্সেল পাঠাতে খরচ ৩০ টাকা
ডাক বিভাগের কর্মকর্তাদের হিসাবে, স্পিড পোস্টের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর কম খরচ। বিদ্যমান অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে বেসরকারি কুরিয়ারের তুলনায় অনেক কম ব্যয়ে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে।
এ সেবায় প্রথম এক কেজি পণ্য পাঠাতে খরচ ১০ টাকা। এরপর প্রতি কেজির জন্য দিতে হয় ৫ টাকা করে। সে হিসাবে পাঁচ কেজির পার্সেল পাঠাতে খরচ মাত্র ৩০ টাকা এবং ২০ কেজির পণ্যের ক্ষেত্রে খরচ ১০৫ টাকা। এসএমএস ও ফোন নোটিফিকেশনের জন্য অতিরিক্ত এক টাকা নেওয়া হয়।
বর্তমানে সাধারণভাবে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত পার্সেল গ্রহণ করা হচ্ছে। পাঁচ কেজির একটি পার্সেল বেসরকারি কুরিয়ারে পাঠাতে যেখানে কমবেশি ১৩০ টাকা লাগে, সেখানে স্পিড পোস্টে একই পণ্যের খরচ ৩০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে স্পিড পোস্টের খরচ প্রায় ৬ টাকা, আর বেসরকারি কুরিয়ারে একই হিসাবে প্রায় ২৬ টাকা। খরচের এ পার্থক্য সেবাটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
চালু হচ্ছে ক্যাশ অন ডেলিভারি
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ভবিষ্যতে বিমানবন্দর থেকে প্রবাসীদের লাগেজ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাগেজ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের জন্য ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) সেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। অনলাইনে কম দামের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অনেক সময় ডেলিভারি চার্জ পণ্যের মূল্যের কাছাকাছি চলে আসে। ডাক বিভাগের কম খরচের সেবা এ সমস্যা কমাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডাক বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) মো. জাকির হাসান নূর জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে সিওডি সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যবস্থা চালু হলে অনলাইন ব্যবসায়ীরা ডাক বিভাগের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর পাশাপাশি গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্যের দামও সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে পণ্য পরিবহনের বাইরেও ই-কমার্স খাতে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস অংশীদার হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে ডাক বিভাগের।
১০ হাজার পোস্ট অফিসকে নেটওয়ার্কে যুক্ত করার লক্ষ্য
বর্তমানে স্পিড পোস্ট সব উপজেলায় পৌঁছালেও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ডাক বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় ১০ হাজার সরকারি ও অবিভাগীয় পোস্ট অফিসকে স্পিড পোস্ট নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব পোস্ট অফিসকে এ নেটওয়ার্কে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ লক্ষ্য অর্জনে পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব যানবাহন কেনার পাশাপাশি ভাড়ায় যানবাহন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্পিড পোস্টের চাহিদা তৈরি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যবহারকারীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডাকঘরের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দেশের সবচেয়ে বড় কুরিয়ার নেটওয়ার্কে পরিণত হতে পারে।
মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ায় ডাকঘরের ব্যস্ততা আগের তুলনায় কমেছে। তবে ই-কমার্সের প্রসারের সঙ্গে সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহনের চাহিদা বাড়ায় স্পিড পোস্টের মাধ্যমে ডাক বিভাগের সেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
মন্তব্য করুন