
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষসহ ৬ হাজার ৪৭৩ জন। একই সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন, আহত হয়েছেন ৪০১ জন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সহিংসতার তুলনায় গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা আড়াই গুণেরও বেশি।

সোমবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এবং নিজেদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে মোট ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯৩১টি ঘটনা ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘাতকেন্দ্রিক।
বিএনপির অন্তর্কোন্দলে নিহত ৪০, আহত ২ হাজার ৬৩২
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ৩৪২টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪০ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩২১টি সংঘর্ষে ১১ জন নিহত ও ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ৯৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন, আহত হয়েছেন ৫৪৫ জন।
রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতের ৮ জন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৬ জন এবং চরমপন্থি দলের একজন সদস্য রয়েছেন। বাকি ১২ জন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সদস্য অথবা তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নির্বাচন ঘিরে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনা
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতার পেছনে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, সংসদ নির্বাচন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দলের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, বাড়িঘর, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক সহিংসতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
রাজনৈতিক মামলায় আসামি ৩৮ হাজারের বেশি
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের চিত্রও তুলে ধরেছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, নয় মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে।
এ ছাড়া সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযানে ৬৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নয় মাসে ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ২৮৮টি ঘটনায় মোট ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে ২০ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে ৫৮টি সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত এবং ৪৬ জন আটক হয়েছেন।
একই সময়ে কারাগারে ৯৫ জন আসামির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন কয়েদি এবং ৫৫ জন হাজতি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলি এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বসতবাড়ি
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা এবং ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিবেদনে তথ্য দেওয়া হয়েছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ৪৩টি হামলার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২৪টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, ছয়জন আহত, ছয়জন গুলিবিদ্ধ এবং ৮৩ জন আটক হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২ ঘটনায় নিহত ১৪৫
প্রতিবেদনে শ্রমিক নির্যাতনের চিত্রও উঠে এসেছে। নয় মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব ও গণপিটুনি, নারী-শিশু ও সাংবাদিক নির্যাতন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো ঘটনাগুলো প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।
মন্তব্য করুন