
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেতে কারা উপকারভোগী হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে সরকার। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা, উপকারভোগী বাছাই, পণ্য বিতরণ ও তদারকির বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ‘সমগ্র বাংলাদেশে টিসিবির উপকারভোগী নির্বাচন এবং ভর্তুকি/সাশ্রয়ীমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা-২০২৬’ জারি করে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, হতদরিদ্র পরিবার, নিম্ন আয়ের ব্যক্তি, ভূমিহীন, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, চা-শ্রমিক, চাতালশ্রমিক, কারখানার শ্রমিক এবং উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিরা টিসিবির কার্ড পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন।
এ ছাড়া বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত এবং অসচ্ছল বয়স্ক নারীপ্রধান পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেসব অসচ্ছল পরিবারে শিশু বা প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন, তারাও অগ্রাধিকার পাবেন।
তবে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি টিসিবির সুবিধা নিতে পারবেন না।
টিসিবির কার্ডের জন্য উপকারভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। প্রয়োজন অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রও লাগতে পারে।
এ ছাড়া উপকারভোগীর নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত একটি সচল মোবাইল নম্বর থাকতে হবে। নির্বাচিত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
নির্বাচিত পরিবারগুলোর তথ্য টিসিবির সেবা অ্যাপের মাধ্যমে তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা হবে। ফলে উপকারভোগী নির্বাচন ও তথ্য ব্যবস্থাপনার বড় অংশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন কার্ডধারী পরিবারকে প্রতি দফায় দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল ও এক কেজি চিনি দেওয়ার কথা রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থাকলে এর সঙ্গে পাঁচ কেজি চালও দেওয়া হবে।
সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্যের সংখ্যা, পরিমাণ ও বিক্রয়মূল্য পরিবর্তন করতে পারবে।
এ ছাড়া পবিত্র রমজান ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছেও ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা যাবে।
নতুন নির্দেশিকায় সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পৃথক তদারক কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এসব কমিটি উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যভান্ডার তৈরি, কার্ড বিতরণ এবং পণ্য বিক্রির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।
জেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক। সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্যরা থাকবেন উপদেষ্টা হিসেবে। কমিটিতে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভার মেয়র বা প্রশাসক, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, সমাজসেবা কর্মকর্তা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা এবং টিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়েও তদারক কমিটি থাকবে। সেখানে সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে রাখা হবে।
অন্যদিকে ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকবে ‘ট্যাগ টিম’। এসব টিম টিসিবির ডিলারের দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে কার্ডধারীদের কাছে পণ্য যথাযথভাবে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে।
ডিলারের দোকানের সামনে টিসিবির পণ্যের ভোক্তা মূল্যতালিকা প্রদর্শন করতে হবে। একই সঙ্গে পণ্য পাওয়ার তারিখ ও সময়, মূল্য এবং কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণ করা পণ্যের সংখ্যা ও পরিমাণ জানাতে হবে।
পণ্য বিক্রিতে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিলারের দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনসমক্ষে পণ্য বিক্রির তথ্য টিসিবির কর্মীদের জানানোর ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
গুদাম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। টিসিবির নিজস্ব অথবা ভাড়া করা গুদামে পণ্য সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব গুদাম পরিদর্শন করতে পারবে সরকার।
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৭৫ লাখ কার্ডধারী রয়েছেন। সম্প্রতি টিসিবির এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, অনিয়মের অভিযোগে এরই মধ্যে ৫৯ লাখ কার্ড বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া কার্ডগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের দেওয়ার কথা রয়েছে।
টিসিবির উপ-পরিচালক শাহাদত হোসেন বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির কার্যক্রমে নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে দুই লাখ টন ভোজ্যতেল, দুই লাখ ২০ হাজার টন মসুর ডাল এবং এক লাখ ১০ হাজার টন চিনি বিক্রির পরিকল্পনা করেছে।
বর্তমানে টিসিবির মাধ্যমে প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকা, প্রতি কেজি মসুর ডাল ৬০ টাকা এবং প্রতি কেজি চিনি ৭০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
টিসিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাশ্রয়ী মূল্যে এসব পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ কমে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
মন্তব্য করুন