
দেশে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ হওয়ার পর অপরাধ দমনে বিকল্প হিসেবে বিশেষ ক্ষমতা আইনে অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ, মাঠপর্যায়ে পুলিশিং জোরদার, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়ানো এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের মর্নিং মিটিংয়ে দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এসব আলোচনা হয়। পুলিশের গোপনীয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। এতে সব অতিরিক্ত আইজিপি, বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান, ডিআইজি (ক্রাইম), ডিআইজি (প্রশাসন)সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভার তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সভায় কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের মতো ভয় পাচ্ছে না। পাশাপাশি পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ঘাটতিও রয়েছে। এ অবস্থায় অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
সভায় অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ‘ক্রসফায়ার’ নেই। তাই বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশপ্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বলেন, ঢালাওভাবে কাউকে আটক না করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ডেটাবেজ তৈরি করা উচিত। এরপর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ডিটেনশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির কিছু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আসামিরা দ্রুত জামিন পেয়ে যাচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হলে আসামির জামিনের অধিকার তৈরি হয়। আবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন এবং সেশন কোর্টে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা থাকলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয় না। ফলে আসামিরা জামিনের সুযোগ পাচ্ছে।
সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা আরও বাড়ানোর প্রস্তাবও আসে। রেলওয়ে পুলিশপ্রধান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে পুলিশের প্রত্যক্ষ কমান্ড বা অধীনে আনার পরামর্শ দেন।
তার মতে, সব অপরাধের মূল কারণগুলোর মধ্যে মাদক অন্যতম। পুলিশ মাদক নিয়ে কাজ করায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি পদে পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে নিয়োগের পরামর্শ দেন সভার আরেক অতিরিক্ত আইজিপিও।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক কেনাবেচা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং মাদক থেকেই বেশির ভাগ অপরাধের জন্ম হচ্ছে। তাই যে কোনো মূল্যে মাদক নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার আসামিরা গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিন পেয়ে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং তদন্তে দুর্বলতার কারণে অনেক আসামি দ্রুত জামিন পেয়ে যাচ্ছে।
এ নিয়ে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে আইনি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ও তদন্তের দুর্বলতাকে জামিনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সভায় অপরাধ দমনে পুরোনো পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেন হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ফারুক আহমেদ। নৌপুলিশের অতিরিক্ত আইজি প্রধান করিম আসামিদের গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সিআইডিপ্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন ডিটেনশনকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন।
সভায় পুলিশের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিষয়ে ‘কনফিউশন’ বা দ্বিধা কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন একজন অতিরিক্ত আইজিপি।
তিনি বলেন, বাইরের নানা গুঞ্জন, অডিও-ভিডিও প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে সদস্যদের মনোবলে প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করে পুরো বাহিনীকে ‘স্ট্রিমলাইনিং’ বা সুসংগঠিত করা জরুরি।
তার মতে, একদিনের চেষ্টায় কোনো অলৌকিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এজন্য ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। কার্যকর পরিবর্তনের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি নীতিগত সংস্কারও দরকার।
সভায় উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন, অপরাধীদের জামিন রোধে আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ এবং পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই উচ্চপর্যায়ের এ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, পুলিশের সেবার মূল ভিত্তি হলো জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। কতটি ছিনতাই, ডাকাতি বা হত্যাকাণ্ড হয়েছে কিংবা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে—শুধু এসব সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব দিয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। পুলিশ বর্তমানে কোন অবস্থানে রয়েছে এবং সেখান থেকে সর্বোচ্চ কী ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব, সেটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তার মতে, পুলিশের প্রতি মানুষের অসন্তোষ বা ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সরাসরি জনসংযোগ বাড়াতে হবে। সম্পর্কের উন্নয়ন ও কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে।
সভায় চাঁদাবাজিসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও আইনগত সীমাবদ্ধতাও পর্যালোচনা করা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে ‘রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে’ অতর্কিত হামলা, মোহাম্মদপুরে জমি দখলের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র মব হামলা, ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রোপার্টিজে সশস্ত্র হামলা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর এবং আদাবরে আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টার ঘটনা।
এ ছাড়া ২৫ মামলার আসামি শীর্ষ মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনা, মিরপুরে চলন্ত যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ ও নাটোরে সংঘর্ষের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
বিভিন্ন ইউনিটপ্রধানদের সঙ্গে সভা শেষে পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে যোগ দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।
সেখানে তিনি মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন। এ ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী।
কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন আইজিপি। সভায় গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
ক্রাইম কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান। এতে সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। তাদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনাও দেন তিনি।
মন্তব্য করুন