
দেশে এলপিজির আমদানি ও মজুত পর্যাপ্ত থাকার কথা বলা হলেও বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। কোথাও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার মিলছে না, আবার কোথাও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে হাজার টাকারও বেশি বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। রান্নার পাশাপাশি অটোগ্যাসের সরবরাহেও দেখা দিয়েছে ঘাটতি।

এ পরিস্থিতিতে আমদানি করা এলপিজির একটি অংশ বাজারে না ছেড়ে মজুত করে রাখার অভিযোগ সামনে এসেছে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) সরকারের কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে বিষয়টি তদন্তের সুপারিশ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা।
তবে এনএসআইয়ের এ অভিযোগের সত্যতা এখনো যাচাই হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এলপিজি আটকে রেখেছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এনএসআইয়ের নজরদারির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি। অক্টোবর থেকে এলপিজির আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কেট প্রিমিয়াম প্রতি টনে প্রায় ৬৪ ডলার বেড়েছে।
সংস্থাটির সন্দেহ, প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজি যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মজুত করে রাখে, তাহলে পরে বেশি দামে বাজারে ছাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের মাস আগস্টেও আমদানি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন।
অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় দেশে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতির সরাসরি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। এলপিজি কোম্পানিগুলোও দাবি করছে, তাদের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
তারপরও বাস্তব বাজারচিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু এক সপ্তাহ আগেও অনেক এলাকায় একই সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে কোথাও কোথাও দাম উঠেছে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
ফলে সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় একটি সিলিন্ডারের জন্য গ্রাহককে এক হাজার টাকারও বেশি অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। শুধু আবাসিক গ্রাহক নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়ছে।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যেও ভিন্নতা রয়েছে। এক পক্ষের দাবি, সমস্যা সরবরাহব্যবস্থার নিচের দিকে। অন্য পক্ষ বলছে, সংকটের কারণ ওপরের স্তরে।
এর মধ্যে সাধারণ গ্রাহকদের প্রশ্ন-দেশে আমদানি হচ্ছে, কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলছে, তাহলে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না কেন? আর পাওয়া গেলেও সরকারি দামের তুলনায় এত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কেন?
এলপিজির সংকট শুধু বাসাবাড়ির রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নেই। অটোগ্যাস ব্যবহারকারী যানবাহনের চালকরাও সমস্যায় পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ হাজার ১০০টি অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে এসবের অনেক স্টেশনে অটোগ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। কোনো কোনো স্টেশনে সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ একই সময়ে আবাসিক ব্যবহার এবং যানবাহনের জ্বালানি-দুই ক্ষেত্রেই এলপিজি সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।
এনএসআই বিষয়টি তদন্তের জন্য শুধু অভিযোগের কথা জানিয়ে থেমে থাকেনি। সংস্থাটি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বড় আমদানিকারকদের কাছে থাকা এলপিজির মজুত জরুরি ভিত্তিতে যাচাই করার সুপারিশ করেছে।
কোন চালান কখন দেশে এসেছে, কখন খালাস হয়েছে, কতটা গুদামে রাখা হয়েছে, কতটা বাজারে ছাড়া হয়েছে এবং কখন তা বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে-এসব তথ্য মিলিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া অক্টোবরের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজির কতটা পরে বাজারে ছাড়া হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
তদন্তে যদি প্রমাণ হয় যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে এলপিজির সরবরাহ আটকে রেখেছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে নাম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওমেরা অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করাকে তারা সবসময় অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।
আরেকটি প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, এলপিজির চালানের গতিবিধি যাচাই করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিয়ে তারা কর্তৃপক্ষের প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন।
ফলে বিষয়টি এখনো তদন্ত ও যাচাইয়ের পর্যায়েই রয়েছে।
সব মিলিয়ে এলপিজি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানি হওয়ার পরও বাজারে সরবরাহ সংকট কেন? কোম্পানিগুলোর পর্যাপ্ত মজুতের দাবি সত্য হলে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে কেন?
সরবরাহ সংকটের জন্য ডিলারদের দায় আছে কি না, আমদানিকারকদের সরবরাহ কমানোর অভিযোগের ভিত্তি কতটা এবং কোথাও এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয়েছে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তের পর।
তবে এরই মধ্যে ভোক্তাদের মূল প্রশ্ন একটাই-দেশে এলপিজি আছে, নাকি নেই; আর থাকলে তা পেতে এত বেশি দাম দিতে হচ্ছে কেন?
মন্তব্য করুন