
জাতীয় সংসদের হুইপের কণ্ঠস্বর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করে খুলনার এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন এজাজ আহমেদ রাজা, জাকিয়া সুলতানা, মো. বাবু ও ইমরান। তাঁদের মধ্যে এজাজ আহমেদ রাজা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আর জাকিয়া সুলতানার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কেএমপির গোয়েন্দা শাখার উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া। তিনি জানান, হুইপের কণ্ঠস্বর এআই দিয়ে নকল করে প্রতারণার ঘটনায় করা মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এজাজ আহমেদ রাজা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জিএম আজিজুর রহমান নগরীর পশ্চিম টুটপাড়ার জিএম এলাহি বকসের ছেলে। তাঁর বড় ভাই জিএম মফিজুর রহমান টিকু যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী।
এজাহারে বলা হয়েছে, খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আরিফ তাঁর বড় ভাই মফিজুর রহমান টিকুকে ফোন করে জানান, জাতীয় সংসদের হুইপ ‘বকুল ভাই’ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর তাঁকে একটি বিদেশি মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়।
ওই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে অপরপ্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে হুইপ বকুল হিসেবে পরিচয় দেন। ২৯ জুলাই রাত ২টা ৩৮ মিনিটে পশ্চিম টুটপাড়ার বাসা থেকে মফিজুর রহমান টিকু তাঁর ভাই ব্যবসায়ী আজিজুর রহমানকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে গ্রুপ কলে যুক্ত করেন। এ সময় প্লাটিনাম জুট মিলের পুরোনো যন্ত্রাংশ কেনাবেচা নিয়ে আলোচনা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, আলোচনার একপর্যায়ে হুইপ পরিচয়দানকারী ব্যক্তি যন্ত্রাংশ কেনার আগে অগ্রিম পেমেন্ট ক্লিয়ার করার কথা বলেন। পরে ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা করতে একজনকে পাঠানোর কথা জানানো হয়।
২৯ জুলাই বিকেল সোয়া ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে মাহাবুবুর রহমান মামুনের আসার কথা থাকলেও তিনি নিজে না এসে এজাজ আহমেদ রাজাসহ আরও একজনকে পাঠান। তাঁদের হাতে প্লাটিনাম জুট মিলের পুরোনো যন্ত্রাংশ কেনার পেমেন্ট হিসেবে দুই কোটি টাকা তুলে দেন ব্যবসায়ী।
এরপর একই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে হুইপ পরিচয়দানকারী ব্যক্তি ব্যবসায়ীকে হার্ডবোর্ড মিল কেনার প্রস্তাব দেন। পরদিন ৩০ জুলাই ভোরে আইনজীবী মোহাম্মদ আলী বাবু হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে জানান, ‘বকুল ভাই’ তাঁকে জুট মিলে যেতে বলেছেন।
সেদিন দুপুরে জুট মিলে গিয়ে যন্ত্রাংশ পছন্দ করার পর এজাজ আহমেদ রাজা ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আরও দেড় কোটি টাকা দেন ব্যবসায়ী। সব মিলিয়ে দুই দফায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দেওয়া হয়।
পরে হুইপ পরিচয়দানকারী ব্যক্তি বারবার সাক্ষাতের কথা বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় সংসদের হুইপ খুলনায় এলে তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন ব্যবসায়ী। তখন পুরো ঘটনা খুলে বললে হুইপ জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এরপরই প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হন ব্যবসায়ী।
এ ঘটনায় ১৮ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ী জিএম আজিজুর রহমান বাদী হয়ে খুলনা থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেন। পরে মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই সাইদুর রহমান।
ডিবি সূত্র জানায়, গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে নগরীর বয়রা রায়েরমহল এলাকা থেকে জাকিয়া সুলতানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার অন্য আসামিদের কাছ থেকেও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, এ ঘটনায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি নতুন ধরনের প্রতারণার কৌশল সামনে এসেছে। চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
মন্তব্য করুন