
ঢাকার মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্যাকেজের নকশা ও নির্মাণকাজের চুক্তি পেয়েছে ভারতের অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি)। চুক্তি দুটির সম্মিলিত মূল্য সর্বোচ্চ ১০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় পাঁচ হাজার কোটি রুপিরও বেশি।

চুক্তির আওতায় রেললাইন স্থাপন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা, সংকেতব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপন করবে প্রতিষ্ঠানটি। এলঅ্যান্ডটির তথ্য অনুযায়ী, কাজগুলো বাংলাদেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্পের অংশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও গতি আসছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে বড় অঙ্কের এই কাজ পেয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি।
এলঅ্যান্ডটির পরিবহন অবকাঠামো বিভাগ ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের কাজ পেয়েছে। প্যাকেজ দুটি হলো—কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৯ এবং সিপি-১০।
সিপি-০৯ প্যাকেজের আওতায় রেললাইন স্থাপন ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কাজ করা হবে। এ কাজে এলঅ্যান্ডটির সঙ্গে অংশীদার হিসেবে থাকবে জাপানি প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশন।
এই প্যাকেজের অধীনে পুরো রুটে রেললাইন স্থাপন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা, ট্র্যাকশন সাবস্টেশন, ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক স্থাপনার নকশা তৈরি, সরঞ্জাম সংগ্রহ, স্থাপন, পরীক্ষা ও চালুর কাজ সম্পন্ন করা হবে।
অন্যদিকে, সিপি-১০ প্যাকেজের আওতায় পুরো নেটওয়ার্কে সংকেতব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপন করবে এলঅ্যান্ডটি।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই দুটি প্যাকেজ সম্মিলিতভাবে মেট্রোরেল লাইন-১-এর মূল পরিচালনব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এর ফলে রাজধানীতে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও এগিয়ে যাবে।
এর আগে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল করিডর লাইন-৬-এর সমন্বিত রেলব্যবস্থা স্থাপনের কাজ পেয়েছিল এলঅ্যান্ডটি। প্রতিষ্ঠানটি ওই কাজ সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে মেট্রোরেল লাইন-৬ বাণিজ্যিকভাবে চালু রয়েছে।
এলঅ্যান্ডটির পরিবহন অবকাঠামো বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান রামকুমার এস বলেন, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কাছ থেকে আবারও কাজের চুক্তি পাওয়া বিশ্বজুড়ে বৃহৎ ও সমন্বিত নগর পরিবহন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতার প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬-এর বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি জাকার্তা মেট্রোরেল প্রকল্পেও কাজ চলছে।
রামকুমার এস বলেন, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন ব্যবস্থা নির্বিঘ্নে একীভূত করার অভিজ্ঞতা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেল লাইন-১-এর মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশটি ভূগর্ভস্থ এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত অংশটি উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরো লাইনে থাকবে ১৯টি স্টেশন। এ ছাড়া পিতলগঞ্জে নির্মাণ করা হবে একটি রেল ডিপো।
অন্যদিকে, প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল লাইন-৫-এর উত্তর রুট সাভারের হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে গাবতলী, মিরপুর-১৪ ও নতুন বাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার রাজধানীতে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেল প্রকল্পসহ আনুমানিক ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
লারসেন অ্যান্ড টুব্রো প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। ভারতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রেল অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এলঅ্যান্ডটি জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, নতুন চুক্তি দুটি বড় অঙ্কের আদেশের অন্তর্ভুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবপদ্ধতিতে পাঁচ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির চুক্তিকে এ শ্রেণিতে রাখা হয়।
শুধু এলঅ্যান্ডটি নয়, মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ পেয়েছে জাপান, চীন ও বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও। প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।
নতুন চুক্তিগুলোর কাজ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণে অগ্রগতি আসবে। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ও গুণগত মান বজায় রাখা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মন্তব্য করুন